
“রাজনীতি আমার পেশা নয়, বিজনেসই আমার পেশা”—সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সম্প্রতি বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হওয়া নেতা ইকবাল হোসেনের এমন বক্তব্যকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র তোলপাড় ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। একজন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতার মুখে এমন মন্তব্য আসার পর বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মনে প্রশ্ন উঠেছে—রাজনীতি কি তাঁর মূল পরিচয়, নাকি কোটি কোটি টাকার ল্যান্ড ব্যবসাই তাঁর প্রকৃত পেশা?
সম্প্রতি একটি জমি-সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে নিজের ব্যবসার দাপট দেখিয়ে ইকবাল হোসেন বলেন, “রাজনীতি তো আমার পেশা নয়, ব্যবসাই আমার পেশা। আমি তো ভাই ল্যান্ডের ব্যবসা করি ২০০২ সাল থেকে। ৪ হাজারেরও অধিক প্লট বিক্রি করেছি। কিছু তো বুঝি।” তাঁর এই দম্ভোক্তির পরেই স্থানীয় সচেতন মহল ও রাজনৈতিক কর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ইকবালের এই বক্তব্যের পর তাঁর বিগত সময়ের বেশ কিছু তথ্য নিয়ে এলাকায় নতুন করে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে তৎকালীন বিতর্কিত সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিনসহ আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের শীর্ষ নেতাদের সাথে গভীর সখ্যতা ও মধুর সম্পর্ক ছিল ইকবালের।
বিএনপির একাধিক তৃণমূল নেতাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ১৭ বছরে বিরোধী দলের বহু নেতাকর্মী যখন মামলা-হামলা ও রাজনৈতিক চাপে যাযাবর জীবন কাটিয়েছেন বা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন, তখন ইকবালের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে কখনো ভাটা পড়েনি। বরং আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত করে তাঁর ল্যান্ড ব্যবসা আরও বিস্তৃত হয়েছে। এমনকি গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের চিহ্নিত বেশ কয়েকজন নেতাকে বিপুল অর্থের বিনিময়ে তিনি ‘শেল্টার’ (আশ্রয়) দিয়ে নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা করেছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগে অনিয়ম-দুর্নীতি, দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজ এবং একজন পেশাদার সাংবাদিককে নির্মমভাবে পেটানোর ঘটনায় ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে ইকবালকে দলের সব পর্যায়ের পদ এবং সদস্যপদ থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে কেন্দ্রের কাছে ক্ষমা চেয়ে আবেদন করলে দল সাময়িকভাবে তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়।
তবে দল থেকে ছাড় পাওয়ার পর তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী। তাঁদের দাবি, ল্যান্ড বিজনেসের আড়ালে নিজস্ব লাঠিয়াল ও কিশোর গ্যাং বাহিনী দিয়ে জোরপূর্বক কম দামে মানুষের জমি কিনতে বাধ্য করছেন ইকবাল। জমির মালিক রাজি না হলে চলছে জোর-জবরদখল ও সম্পত্তি জিম্মি করা। তাঁর এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সম্প্রতি ভুক্তভোগী এক ব্যবসায়ী নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন, যা দেশের বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে।
সচেতন মহলের মতে, যেখানে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব কঠোরভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে দলের নাম ভাঙিয়ে কোনো প্রকার দখলবাজি সহ্য করা হবে না; সেখানে একজন সাবেক সাধারণ সম্পাদকের মুখে “রাজনীতি নয়, ব্যবসাই আমার পেশা” বলা এবং সেই ব্যবসার আড়ালে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার বিষয়টি দলের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করছে।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে এবং ওনার নিজের দেওয়া বক্তব্য নিয়ে জানতে বিএনপি নেতা ইকবাল হোসেনের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি চরম রাগান্বিত হয়ে ওঠেন। “রাজনীতি নয়, ব্যবসাই আপনার পেশা—ল্যান্ড ব্যবসার বাইরে আপনার কি আর কোনো ব্যবসা আছে?”—সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, “কেন আপনার কাছে আমি এতো কিছুর জবাবদিহিতা করবো কেন? কেন আপনি আমাকে প্রশ্ন করেন?”
তখন সাংবাদিকের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়—‘প্রশ্ন করা কি অন্যায়?’ এর উত্তরে ইকবাল হোসেন আরও চড়া সুরে বলেন, “কেন আপনি আমাকে এই প্রশ্ন করেন? বলেন। আপনি কি কৈফিয়ত দেয়ার মতো আমার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাকি?”
প্রতিউত্তরে সাংবাদিকের পক্ষ থেকে জানানো হয়—‘এটা কোনো কৈফিয়ত বা জবাবদিহি নয়, একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে এটা শুধুই জানতে চাওয়া।’ এই কথা বলার সাথে সাথেই ক্ষুব্ধ হয়ে ইকবাল হোসেন ফোনের লাইনটি কেটে দেন। পরবর্তীতে ওনার ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।







