আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ থেকে এখন জমি দখল সিন্ডিকেটের ‘গডফাদার’!

৫ আগস্টের পরও বেপরোয়া নারায়ণগঞ্জের ইকবাল

119
শামীম ওসমানের সাথে আঁতাত করে ১৭ বছর বহাল তবিয়তে থাকা সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন বেপরোয়া।
শামীম ওসমানের সাথে আঁতাত করে ১৭ বছর বহাল তবিয়তে থাকা সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন বেপরোয়া।

আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৭ বছরের শাসনামলে যখন বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা মামলা-হামলায় জর্জরিত হয়ে যাযাবর জীবন কাটাচ্ছিলেন, তখন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও নাসিক ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন ছিলেন চরম মহাসুখে। তৎকালীন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ এমপি শামীম ওসমান, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন মিয়াসহ আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের শীর্ষ নেতাদের সাথে গভীর সখ্যতা ও আতাঁত বজায় রেখে দিব্যি চালিয়ে গেছেন নিজের সাম্রাজ্য। নিজে মুখে ২০০২ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৪ হাজারেরও বেশি প্লট বিক্রির দম্ভোক্তি করলেও, স্থানীয়দের অভিযোগ-এই বিশাল ল্যান্ড ব্যবসার আড়ালে লুকিয়ে আছে শত শত মানুষের জমি জবরদখল ও কান্নার ইতিহাস।

গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই বিতর্কিত নেতা নিজের ভোল পাল্টে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় ল্যান্ড ব্যবসার আড়ালে জোরপূর্বক জমি দখলের একাধিক অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। তারই ধারাবাহিকতায় এবার নারায়ণগঞ্জের প্রবেশদ্বার সাইনবোর্ডের ‘মিতালী মার্কেট’ সংলগ্ন এক ব্যবসায়ীর সম্পত্তি জোরপূর্বক জবরদখলের মরিয়া চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও ‘স্থিতাবস্থা’ -কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পর্দার আড়াল থেকে এই দখল মিশনের মূল কলকাঠি নাড়ছেন খোদ ইকবাল হোসেন। আর মাঠে থেকে এই মিশন বাস্তবায়ন করছেন তার আপন ভগ্নিপতি (বোনজামাই) মুক্তার হোসেন। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই ইকবালের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা ও ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারায় কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) জারি করেছেন নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) আদালত।

অনুসন্ধানে ইকবালের বিগত সময়ের বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা বলছে, আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শামীম ওসমান ও দলটির শীর্ষ নেতাদের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও দহরম মহরম সম্পর্ক ছিলো ইকবালের। বিএনপির তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিগত দীর্ঘ শাসনামলে যখন সাধারণ কর্মীদের ঘরে ঘুমানোর জায়গা ছিল না, তখন ইকবাল আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত করে বহাল তবিয়তে কোটি কোটি টাকার ল্যান্ড বিজনেস পরিচালনা করেছেন। শুধু তাই নয়, গত ৫ আগস্টের পর গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর, ইকবালের বিরুদ্ধে তার সেই বিগত দিনের আওয়ামী লীগের ‘সাথী ও দোসরদের’ বিপুল অর্থের বিনিময়ে শেল্টার (আশ্রয়) দিয়ে নিরাপদে রাখার গুরুতর অভিযোগও তুলেছে স্থানীয় সচেতন মহল।

আওয়ামী লীগ পতনের পর নিজের প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় নানা অনিয়ম-দুর্নীতি, দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজ এবং এক পেশাদার সাংবাদিককে নির্মমভাবে পেটানোর ঘটনায় সমাদৃত হন ইকবাল। ফলশ্রুতিতে ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে তাকে দলের সব পর্যায়ের পদ এমনকি সাধারণ সদস্য পদ থেকেও আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে চতুরতার আশ্রয় নিয়ে ভুল স্বীকার ও ক্ষমা চেয়ে আবেদন করলে অতি সম্প্রতি তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয় দল।

কিন্তু দল থেকে ছাড় পাওয়ার পর আইনি বা রাজনৈতিকভাবে সুধরে যাওয়ার পরিবর্তে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী জানান, বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের পর এলাকায় যেন ‘আলাদিনের চেরাগ’ পেয়েছেন ইকবাল। এখন তিনি নিজস্ব কিশোর গ্যাং বাহিনী ও লাঠিয়ালদের দিয়ে জোরপূর্বক কম দামে মানুষের জমি কিনে নিচ্ছেন। তার কাছে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে, আর কেউ রাজি না হলে চলছে জোর-জবরদখল।

সর্বশেষ গত ২৭ মে সকাল ৭টায় ইকবালের প্রত্যক্ষ মদদে ও তার বোনজামাই মুক্তার হোসেনের নেতৃত্বে ২০/২৫ জনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল রামদা, চাপাতি, লোহার রড ও সাবল নিয়ে সাইনবোর্ড মিতালী মার্কেট সংলগ্ন কাজী আব্দুস সাত্তারের পৈত্রিক জমিতে অনধিকার প্রবেশ করে টিনের বেড়া দেওয়ার চেষ্টা করে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী তাৎক্ষণিক জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল করলে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দখলদাররা অস্ত্র ও সরঞ্জামাদি ফেলে পালিয়ে যায়, যার স্পষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানান ঐ ব্যবসায়ী। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী এই জবরদখলকারী ভূমিদস্যু চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন।

এদিকে, বিএনপির নাম ভাঙিয়ে বা অতীত রাজনৈতিক ও আওয়ামী আঁতাতের প্রভাব খাটিয়ে যারা আদালতের রায় অমান্য করে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি ও মসজিদের জায়গা দখল করতে চায়, তাদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা ও সচেতন মহল।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা ইকবাল হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেন নি। পরবর্তীতে তাঁর ব্যবহৃত নম্বরে ক্ষুদে বার্তা (ঝগঝ) পাঠিয়ে এ বিষয়ে তাঁর সুনির্দিষ্ট বক্তব্য চাওয়া হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো রিপ্লাই বা সাড়া পাওয়া যায়নি।”