ফতুল্লায় মাদকের অভয়ারণ্য: নেপথ্যে কারা? জিম্মি এলাকাবাসী

144
ফতুল্লা থানা এলাকায় মাদক ব্যবসার নেপথ্যে কারা? খোঁজ মিললো
ফতুল্লা থানা এলাকায় মাদক ব্যবসার নেপথ্যে কারা? খোঁজ মিললো

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানা এলাকার ইসদাইর, গাবতলী, মাসদাইর, দেলপাড়া, পিলকুনি ও রেললাইন সংলগ্ন এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে সুসংগঠিত ও ভয়ংকর এক মাদক চক্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রছায়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বল নজরদারি, কিছু অসাধু প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং কিশোর গ্যাংকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেই ফতুল্লাজুড়ে এই বিষাক্ত কারবারের বিস্তার ঘটেছে।

সম্প্রতি একের পর এক কুপিয়ে জখম, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, গ্রেফতার ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে ফতুল্লার মাদক সাম্রাজ্যের এই ভয়ংকর চিত্র। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফতুল্লার বিভিন্ন স্পট থেকে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা ও দেশীয় অস্ত্রসহ একাধিক মাদক কারবারিকে পুলিশ ও র‌্যাব গ্রেফতার করলেও মূল হোতারা বরাবরই অধরাই থেকে যাচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ফতুল্লায় মাদক ব্যবসা এখন কেবল কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ‘অপরাধ অর্থনীতিতে’ পরিণত হয়েছে। এই মাদকের কালো টাকার জোরে এলাকায় গড়ে উঠছে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ বাহিনী এবং নতুন নতুন রাজনৈতিক প্রভাব বলয়।

সম্প্রতি গাবতলী এলাকায় মুখোশধারী সন্ত্রাসীদের হামলায় অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় এলাকাবাসী সরাসরি এই মাদক সিন্ডিকেটকেই দায়ী করেছেন। স্থানীয়দের দাবি, এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার এবং মাদকের স্পটগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখাই এই সব নিত্যদিনের সংঘর্ষের মূল কারণ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ফতুল্লার রেললাইন এলাকা, টিনশেড বস্তি, নদীপথ সংলগ্ন কিছু সুনির্দিষ্ট পয়েন্ট এবং শ্রমিক অধ্যুষিত মহল্লাগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মাদক সরবরাহের নিরাপদ রুট। বিশেষ করে রাতের বেলায় মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা ব্যবহার করে পাড়ায় পাড়ায় মাদক পৌঁছে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে চক্রগুলো এখন ড্রোনের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করছে বলে তথ্য মিলেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক একাধিক অভিযানে দেখা গেছে, অনেক মাদক আস্তানায় নজরদারির জন্য সিসি ক্যামেরা, অবৈধ অস্ত্র, বিপুল নগদ টাকা এমনকি ড্রোন পর্যন্ত ব্যবহার করা হচ্ছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এসব আলামত প্রমাণ করে যে ফতুল্লার মাদক চক্রগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত, চতুর ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে।

এলাকাবাসীর প্রকাশ্য অভিযোগ, কিছু রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ছদ্মবেশী নেতা, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল এবং অর্থের বিনিময়ে সুবিধাভোগী মহলের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মাদক কারবারিরা বছরের পর বছর বহাল তবিয়তে টিকে আছে। মাঝে মধ্যে ছোটখাটো লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে দু-একজন খুচরা বিক্রেতা বা মাদকসেবী আটক করা হলেও মূল গডফাদাররা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা দাবি করছেন, সম্প্রতি ফতুল্লাকে ঘিরে বিশেষ নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং বড় বড় সিন্ডিকেটগুলোকে হাতেনাতে শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।

স্থানীয় শিক্ষক ও অভিভাবকদের অভিযোগ, ফতুল্লায় মাদকের সহজলভ্যতার কারণে স্কুল-কলেজপড়ুয়া অনেক কিশোর ও তরুণ আসক্ত হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে বস্তি ও নিম্নআয়ের এলাকাগুলোতে ইয়াবা ও গাঁজার বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য এক বড় সামাজিক বিপর্যয়।

সমাজকর্মীদের মতে, শুধুমাত্র সাধারণ কিছু অভিযান চালিয়ে এই গভীর ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে জড়িত সুনির্দিষ্ট অর্থের উৎস, রাজনৈতিক প্রভাব, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক একসঙ্গে গোড়া থেকে ভাঙতে না পারলে ফতুল্লার পরিস্থিতি আরও বেশি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

ফতুল্লাকে মাদকের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ৫টি সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছেন—

১. মাদকের মূল গডফাদারদের তালিকা প্রকাশ করতে হবে।

২. রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে থাকা নেপথ্যের মদদদাতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।

৩. কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ও নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে।

৪. বস্তি ও রেললাইন এলাকাগুলোতে স্থায়ী পুলিশ বক্স স্থাপন ও টহল বাড়াতে হবে।

৫. আসক্ত তরুণদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

এলাকাবাসীর স্পষ্ট দাবি—শুধু ছোট ও খুচরা বিক্রেতা ধরলে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না; নেপথ্যের বড় শক্তি ও গডফাদারদের গোড়া থেকে উপড়ে না ফেললে ফতুল্লা কখনই মাদকমুক্ত হবে না।