
অনুসন্ধানী বিভাগ, নারায়ণগঞ্জ সমাচার:
আলাদিনের চেরাগ পেয়ে ফতুল্লার মাসদাইর ও বাড়ৈভোগ এলাকায় সম্পদের পাহাড় গড়া ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ জাকারিয়া জাকির ওরফে জাকির মেম্বারের বিরুদ্ধে এবার উঠেছে ভয়াবহ কর ফাঁকির অভিযোগ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাকির মেম্বারের যেসব আলিশান বহুতল ভবন, মার্কেট ও রিকশার গ্যারেজের তথ্য বিভিন্ন অভিযোগে উঠে এসেছে এবং যেগুলোর বিষয় তিনি নিজেই ইতিপূর্বে গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন—তার অধিকাংশেরই কোনো উল্লেখ নেই তাঁর বার্ষিক ইনকাম ট্যাক্স (আয়কর) ফাইলে। সম্পদ গোপন করে বছরের পর বছর বিপুল অঙ্কের কর ফাঁকি দেওয়ায় সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইনকাম ট্যাক্স অফিসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ‘নারায়ণগঞ্জ সমাচার’কে জানান, “সাবেক এই মেম্বারের যেসব সম্পদের বিষয়ে তথ্য ও প্রমাণ আমাদের হাতে এসেছে, তার কোনোটিই তিনি তাঁর আয়কর ফাইলে প্রদর্শন করেননি। তাঁর এই সকল বিপুল সম্পত্তি ও মাসিক আয়ের উৎস যদি ট্যাক্স ফাইলে সঠিকভাবে দেখানো হতো, তবে প্রতি বছর কেবল তাঁর একার ফাইল থেকেই সরকারের কয়েক কোটি টাকা ট্যাক্স বা রাজস্ব আদায় হতো।”
ঐ কর্মকর্তা আরও যোগ করেন, “যেহেতু তিনি ফাইলে এই বিপুল সম্পদ ও আয়ের উৎস লুকিয়ে রেখেছেন, সেহেতু রাষ্ট্র প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার নিশ্চিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে এবং শীঘ্রই তাঁর এই অবৈধ সম্পদ ও কর ফাঁকির বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ইনকাম ট্যাক্স ফাইলে সম্পদ গোপনের এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে জানতে ‘নারায়ণগঞ্জ সমাচার’-এর পক্ষ থেকে জাকারিয়া জাকির ওরফে জাকির মেম্বারের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে দাবি করেন, “আমার ট্যাক্স ফাইল আছে।”
পরবর্তীতে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়—‘আপনার যে ট্যাক্স ফাইল আছে, সেই ফাইলে আপনার সকল সম্পদের বিবরণ দেওয়া নেই, এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য আমাদের কাছে আছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?’
এই প্রশ্ন করা মাত্রই সাবেক এই মেম্বার চরম উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে তিনি প্রতিবেদকের উদ্দেশ্যে বলেন, “কী সমস্যা তোমার?”
প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে শান্তভাবে বলা হয়—‘কোনো সমস্যা নেই, আমাদের কাছে তথ্য এসেছে, সেই বিষয়েই কেবল আপনার বক্তব্য বা মন্তব্য জানতে চাইছি।’
কিন্তু জাকারিয়া জাকির কোনো সদুত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং রাগান্বিত সুরে বলেন, “আমি পরে কথা বলছি তোমার সাথে।” এই কথা বলেই তিনি তড়িঘড়ি করে ফোন কেটে দেন। তাঁর এমন উত্তেজিত আচরণ ও ফোন কেটে দেওয়ার ঘটনাটি সম্পদ গোপনের অভিযোগকে আরও বেশি সন্দেহজনক করে তুলেছে বলে দাবি বিশ্লেষকদের।
জাকির মেম্বারের মতো প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের কর ফাঁকির এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসের পর স্থানীয় সাধারণ নাগরিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও চাকুরিজীবীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
এলাকার সাধারণ মানুষের বক্তব্য, “সরকার একজন সাধারণ দোকানদার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবীর কাছ থেকে আয়কর আদায়ের ব্যাপারে অত্যন্ত কড়াকড়ি ও শক্ত অবস্থান নেয়। একটু এদিক-সেদিক হলেই নোটিশ পাঠানো হয়। কিন্তু এই ধরনের বড় বড় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো অজ্ঞাত কারণে শক্ত অবস্থান নেয় না?”
বাড়ৈভোগ এলাকার এক চাকুরিজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা বছরে অল্প কিছু টাকা আয় করি। সেই আয়ের ওপর ট্যাক্স দিতে গিয়ে আমাদের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। আর কিছু বাটপাররা কোটি কোটি টাকার সম্পদ বানিয়েও ঠিকমতো ট্যাক্স দেয় না। ফলে এই রাজস্ব ঘাটতির পুরো চাপ এসে পড়ে আমাদের মতো সাধারণ জনগণের ওপর। আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর ফতুল্লা থানায় কয়েকটি মামলা হলেও জাকির মেম্বার এখনো এলাকাতেই বহাল তবিয়তে আছেন। বিএনপির পদহীন এক নেতা, যিনি বিগত সময়ে তাদের এই অবৈধ আয়ের ভাগিদার ছিলেন এবং বর্তমানে সেই সব সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করছেন; তাকে মোটা অঙ্কের টাকায় ‘ম্যানেজ’ করে তিনি এখনো এলাকায় প্রকাশ্যে জমি ও প্লটের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। কর ফাঁকির এই নতুন তথ্য সামনে আসার পর সচেতন মহল মনে করছেন, এবার এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) ও দুদক এই করখেলাপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।







