
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে খায়রুল ইসলাম সজিবকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতাকে। একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে একাধিক চাঁদাবাজির অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে আটকের কথা জানানো হয়, অন্যদিকে অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে।
ঘটনার এই পরস্পরবিরোধী চিত্র সাধারণ মানুষের কাছে বিভ্রান্তিকর বলেই মনে হচ্ছে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে যদি অভিযোগের ভিত্তি যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে থাকে, তাহলে মুক্তি কেন? আর যদি অভিযোগ যথেষ্ট না হয়, তাহলে দলীয় বহিষ্কারের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত কেন?
নারায়ণগঞ্জের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত এখন ঘুরেফিরে একই আলোচনা—প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে কি আইনের প্রয়োগ ভিন্নভাবে হয়?
স্থানীয় অনেক ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকের বক্তব্য, দেশে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নাটকীয়ভাবে আটক করে পরে দ্রুত ছেড়ে দেওয়া হলে অপরাধ দমনের বদলে উল্টো ভুল বার্তা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। এতে সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যায় এবং অপরাধে জড়িত অন্যদের মধ্যেও এক ধরনের সাহস তৈরি হয়।
একজন ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাধারণ মানুষ হলে থানায় যাওয়ার আগেই জীবন দুর্বিষহ হয়ে যেত। কিন্তু প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে কেন বারবার ভিন্ন চিত্র দেখা যায়?
আরেকজন নাগরিকের ভাষ্য, আটক করে যদি ছেড়েই দেওয়া হয়, তাহলে জনগণ এটাকে কীভাবে দেখবে? এতে তো মানুষ ভাববে প্রভাব থাকলে সবকিছুই সম্ভব।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার ও প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা। কারণ জনগণ এখন শুধু বক্তব্য নয়, দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চায়।
তাদের মতে, যদি কোনো অভিযোগ মিথ্যা হয়ে থাকে তাহলে সেটিও প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করা উচিত। আর অভিযোগ সত্য হলে আইনগত প্রক্রিয়া কোথায় গিয়ে থেমে গেল, সেটিরও জবাব থাকা প্রয়োজন। নীরবতা বরং সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এমন ঘটনাগুলো বিরোধীদের সমালোচনার সুযোগ করে দেয় এবং সরকারবিরোধী জনমত তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও প্রভাবশালীদের দায়মুক্তির অভিযোগ যখন জনপরিসরে আলোচিত বিষয়, তখন এ ধরনের ঘটনা সরকারের ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে রাজনৈতিক ক্ষতি কতটা হবে বা কোনো নির্দিষ্ট নেতৃত্ব জনপ্রিয়তা হারাবে কি না, সেটি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট যে, জনগণের বড় একটি অংশ এখন জানতে চায়—কী অভিযোগে আটক করা হয়েছিল, তদন্তের অবস্থা কী এবং কী কারণে তাকে মুক্তি দেওয়া হলো।
নারায়ণগঞ্জের সচেতন মহলের দাবি, প্রশাসনের উচিত এ বিষয়ে স্পষ্ট ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া। কারণ আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো স্বচ্ছতা। আর স্বচ্ছতা না থাকলে গুঞ্জন জন্ম নেয়, গুঞ্জন থেকে অবিশ্বাস তৈরি হয়, আর অবিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থাকে দুর্বল করে দেয়।
আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই একটাই এই ঘটনার মাধ্যমে কি আইনের শাসনের বার্তা দেওয়া হয়েছে, নাকি সমাজে এমন ধারণা আরও শক্তিশালী হয়েছে যে প্রভাবশালীদের জন্য নিয়মের প্রয়োগ ভিন্ন? সেই প্রশ্নের উত্তর এখন প্রশাসনের কাছ থেকেই প্রত্যাশা করছে নারায়ণগঞ্জবাসী।







