সংকটের মাঝেও টিকে থাকার লড়াই করছেন নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্ট মালিকরা

22
নারায়ণগঞ্জ গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল ফ্যাক্টরি সংকট
গ্যাস ও অর্ডার সংকটে নারায়ণগঞ্জের নিটওয়্যার ও গার্মেন্ট শিল্পে মন্দা।

একসময় বাংলাদেশের নিটওয়্যার শিল্পের রাজধানী হিসেবে পরিচিত ছিল নারায়ণগঞ্জ। ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ,  সোনারগাঁ, রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজারের শিল্পাঞ্চলে দিন-রাত চলত উৎপাদনের ব্যস্ততা। লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং শত শত কোটি টাকার রপ্তানি আয় ঘিরে গড়ে উঠেছিল জেলার অর্থনীতি। কিন্তু বর্তমানে সেই শিল্পনগরী কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। অর্ডার সংকট, গ্যাসের ঘাটতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্যে টিকে থাকার লড়াই করছেন নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্ট মালিকরা।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকট কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি। বরং কয়েকটি বড় সমস্যার সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এই পরিস্থিতি। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্ডার সংকট। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আগের তুলনায় কম অর্ডার দিচ্ছেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে পণ্য কিনতে চাপ দিচ্ছেন। ফলে অনেক কারখানা লোকসানে উৎপাদন চালাতে বাধ্য হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জের শিল্পখাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আগে একটি মাঝারি কারখানা বছরে যত অর্ডার পেত, বর্তমানে তার অর্ধেকও পাচ্ছে না। বড় কারখানাগুলো কোনোভাবে নিজেদের আন্তর্জাতিক ক্রেতা ধরে রাখতে পারলেও ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে সাব-কন্ট্রাক্ট অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে।

সংকটের আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে উৎপাদন ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পরিবহন, কাঁচামাল আমদানি এবং শ্রমিক মজুরি সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে লাভের পরিমাণ কমে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে তা লোকসানে পরিণত হয়েছে। মালিকদের অভিযোগ, ক্রেতারা এখনও কয়েক বছর আগের দামে পণ্য কিনতে চায়, অথচ উৎপাদন খরচ বেড়েছে বহুগুণ।

গ্যাস সংকটও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিশেষ করে নিটওয়্যার ও ডাইং কারখানাগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। শিল্প মালিকরা মনে করেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে এই খাতকে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রাখা কঠিন হবে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যায় কারখানা বন্ধের সংখ্যা থেকে। গত কয়েক বছরে শুধু নারায়ণগঞ্জেই ৩০টির বেশি গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। অনেক মালিক ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন, আবার কেউ কেউ কারখানা বিক্রির পথ বেছে নিয়েছেন।

তবে সংকটের দায় শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর চাপিয়ে দিতে রাজি নন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, শিল্পখাতে দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পণ্যের বহুমুখীকরণে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হয়নি। বিশ্বের পোশাক বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হলেও অনেক কারখানা এখনও পুরনো উৎপাদন পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

অন্যদিকে শ্রমিকরাও এই সংকটের সরাসরি ভুক্তভোগী। কারখানা বন্ধ হওয়া, উৎপাদন কমে যাওয়া কিংবা অর্ডার হ্রাসের কারণে অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। ওভারটাইম কমে যাওয়ায় আয়ও কমেছে। ফলে শিল্প সংকট ধীরে ধীরে সামাজিক সংকটে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তবে সবকিছুর পরও আশাবাদী থাকতে চান নারায়ণগঞ্জের শিল্প উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এখনও বিশ্বের অন্যতম বড় রপ্তানি খাত। সরকারের নীতিগত সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, গ্যাস-বিদ্যুতের স্থিতিশীল সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্ট শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

কারণ নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্ট শিল্প শুধু কয়েকজন ব্যবসায়ীর ব্যবসা নয়; এটি লাখো শ্রমিকের জীবিকা, হাজারো পরিবারের স্বপ্ন এবং জেলার অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। সেই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতেই আজ প্রতিকূল সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্ট মালিকরা।