
নারায়ণগঞ্জ শহরের দীর্ঘদিনের একটি জটিল ও আলোচিত সমস্যা হচ্ছে ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা হকার বাণিজ্য। নগরবাসীর স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়া, যানজট বৃদ্ধি এবং শহরের নান্দনিকতা নষ্ট হওয়ার অভিযোগ বহুদিন ধরেই রয়েছে। বিভিন্ন সময় এ সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা টেকসইভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী তার দায়িত্বকালীন সময়ে একাধিকবার ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি প্রশাসনের সহযোগিতায় অভিযান পরিচালনা করলেও নানা কারণে তা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। সে সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের বিরোধিতা এবং হকারদের জীবিকার প্রশ্ন সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে।
বিশেষ করে স্থানীয় রাজনীতির প্রভাবশালী গডফাদার শামীম ওসমান-এর সঙ্গে মতবিরোধের বিষয়টি তখন আলোচনায় আসে। ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি, পাল্টাপাল্টি অবস্থান এবং সংঘর্ষের ঘটনাও বিভিন্ন সময় সামনে এসেছে বলে স্থানীয়দের একটি অংশ দাবি করে। তবে এসব ঘটনার ব্যাখ্যায় ভিন্নমতও রয়েছে, এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো নিজেদের অবস্থান থেকে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে এসেছে।
এদিকে দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা ছিল। অনেকেই মনে করেন, কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক সমর্থন বা সমন্বয়ের অভাব থাকায় স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোগগুলো পূর্ণতা পায়নি। ফলে ডা. আইভীর অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করার প্রচেষ্টাও স্থায়ী সফলতা অর্জন করতে পারেনি।
বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি শহরের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে পথচারীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় চলাচল নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এবার আগের তুলনায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বয় বেশি দৃশ্যমান হতে পারে। এ কারণে অনেকেই মনে করছেন, পূর্বের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন এই উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখতে পারে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বিত অবস্থান থাকলে অভিযান পরিচালনা করা সহজ হবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, কেবল উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কারণ হকারদের একটি বড় অংশ এই ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকলে তারা আবারও ফুটপাতে ফিরে আসতে পারে। ফলে সমস্যাটি পুনরায় জটিল হয়ে উঠার আশঙ্কা থেকেই যায়।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে হকারদের জন্য নির্ধারিত স্থান, বাজার বা জোন তৈরি করা গেলে একদিকে যেমন পথচারীদের চলাচল নির্বিঘ্ন হবে, অন্যদিকে হকাররাও তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে। উন্নত শহর ব্যবস্থাপনায় এমন উদাহরণ রয়েছে, যেখানে উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
নগরবাসীর একটি বড় অংশ এবার এই উদ্যোগ নিয়ে আশাবাদী। তারা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটাতে হলে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও জরুরি। অন্যদিকে কেউ কেউ শঙ্কা প্রকাশ করছেন, যদি রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো চাপ তৈরি হয়, তাহলে আগের মতোই এই উদ্যোগও থমকে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়টি আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অতীতের অভিজ্ঞতা, বর্তমানের উদ্যোগ এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এই তিনের সমন্বয়ে এবার একটি স্থায়ী সমাধান আসবে কিনা, সেটিই এখন দেখার বিষয়।







