
আইন ও ধর্মীয় বিধান মেনে মাদকাসক্ত ও নির্যাতনকারী স্বামীকে তালাক দেওয়ার ৯ মাস পরও রেহাই পাচ্ছেন না এক তরুণী। সাবেক স্বামী রাশেদুল আলম মামুন ও তার লোকজনের অব্যাহত হুমকি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর ছবি ছড়ানোর ভয়ভীতি এবং নানা কায়দায় উত্ত্যক্তের মুখে এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন ওই তরুণী ও তাঁর পরিবার। এর ওপর বিবাদী পক্ষের হয়ে থানা-পুলিশের কতিপয় কর্মকর্তার অতি-উৎসাহী ভূমিকা এবং রহস্যময় ব্যক্তির ফোন ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা ওই তরুণী মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে কান্নাবড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমি স্বেচ্ছায় ওরে ডিভোর্স দিয়েছি। ও সুস্থ মানুষ নয়, একজন সাইকো। ও মাদকাসক্ত, বিনা কারণে আমাকে মারধর করতো। তাই ৯ মাস আগে তারে আমি ডিভোর্স দিয়েছি। তারপরও সে আমাকে নানাভাবে উত্যক্ত করছে। আপনারা আমাকে বাঁচান, আমাকে বাঁচান।”
নথিপত্র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর উত্তর মাসদাইর এলাকার ঐ তরুণীর সঙ্গে সিরাজদ্দৌলা রোডের হেলাল উদ্দিন মিয়ার ছেলে মোঃ রাশেদুল আলম মামুনের (৪৩) বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই স্বামীর চরম মাদকাসক্তি, মানসিক নির্যাতন ও পরনারী আসক্তির কারণে সংসার টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে গত বছরের ১০ অক্টোবর স্ত্রী কেয়া তাঁর স্বামীকে একতরফা তালাক (তালাকে তাওফিজ) প্রদান করেন।
আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ ডাকবিভাগের রেজিস্ট্রি ডাকযোগে সিটি কর্পোরেশন কার্যালয় বরাবর তালাকের নোটিশ পাঠানো হয়। পরবর্তীতে চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি কাজী অফিসে এই তালাক আইনগতভাবে বালামভুক্ত (রেজিস্ট্রি) করা হয়। এর আগে স্বামীর নির্যাতনের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ এবং ফতুল্লা থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি নং- ১০৭৫) করেছিলেন ওই তরুণী।
ভুক্তভোগী পরিবারটির দাবি, তালাক সম্পন্ন হওয়ার পর থেকেই মামুন ওই তরুণীকে ফিরিয়ে নিতে নানা কায়দায় বিরক্ত ও হুমকি দিয়ে আসছিল। এর মধ্যেই নতুন করে যুক্ত হয়েছে পুলিশি হয়রানি।
ভুক্তভোগী তরুণী ও তাঁর বাবাকে সম্প্রতি ফোনে থানায় ডাকেন নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শহীদুল। একজন ভুক্তভোগী নারীকে কেন এভাবে থানায় ডাকা হচ্ছে—সে বিষয়ে জানতে আজ বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টায় এসআই শহীদুলকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, “আমি এখন জেলখানায় আছি, রিমান্ডের আসামীর জবানবন্দী নিচ্ছি। এক ঘণ্টা পরে ফোন দেই।”
কিন্তু এই ফোনালাপের মাত্র ১০ মিনিট পরই ঘটে এক রহস্যময় ও উদ্বেগজনক ঘটনা। ‘কায়সার’ নামে এক ব্যক্তি নিজেকে শিক্ষানবিস সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এই প্রতিবেদককে ফোন করেন। কিন্তু তিনি কোন পত্রিকায় বা গণমাধ্যমে কাজ করেন তা বলতে পারেন নি। তবে তাকে যুগের চিন্তা নামে একটি পত্রিকা থেকে বের করে দেয়া হয়েছে বলে জানান এই কায়সার।
তিনি সরাসরি জানতে চান, “আপনি কি এসআই শহীদুলকে ফোন করেছিলেন? আপনি কি ঐ মেয়ে ও মামুনের বিষয়ে জানতে ফোন করেছিলেন?” প্রতিবেদক হ্যাঁ সূচক জবাব দিলে ওই কথিত সাংবাদিক মেয়ে ও তাঁর বাবা সম্পর্কে নানা আপত্তিকর ও বিরূপ মন্তব্য করতে থাকেন।
তখন এই প্রতিবেদক তাঁর পরিচয় এবং এসআই শহীদুলকে দেওয়া ফোনে তিনি কেন মাঝখানে কথা বলছেন তা জানতে চান। কায়সার নামের ওই ব্যক্তি আসলে পুলিশের ‘ফর্মা’ বা সোর্স কিনা—এমন প্রশ্ন করতেই তিনি চরম রাগান্বিত হন এবং এই প্রতিবেদককে নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি ফোন কেটে দেন। পুলিশের নম্বরে ফোন দেওয়ার পর সেই তথ্য কীভাবে একজন বহিরাগত ব্যক্তির কাছে চলে গেল এবং কেন সে পুলিশের হয়ে সাংবাদিককে হুমকি দিচ্ছিল—তা নিয়ে খোদ পুলিশ প্রশাসনের পেশাদারিত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
পরবর্তীতে এসআই শহীদুল নির্ধারিত সময় পর এই প্রতিবেদককে ফোন দেন। বাবা ও তাঁর মেয়েকে থানায় তলব করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মামুন নামে এক লোক থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন যে, তার স্ত্রীকে তার সাথে সংসার করতে দেয়া হচ্ছে না। মেয়ের পক্ষ থেকে একতরফা একটি ডিভোর্সের কথা শুনেছি, কিন্তু সেটি পুরোপুরি আইনসম্মত কিনা তা জানতে হবে। এজন্যই তাকে ডেকেছিলাম বিষয়টি জানার জন্য।”
তবে স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, যেখানে রেজিস্ট্রি ডাকের রসিদ এবং কাজী অফিসের বালাম বইয়ে তালাক কার্যকরের অকাট্য প্রমাণ রয়েছে, সেখানে ৯ মাস পর একজন মাদকাসক্ত সাবেক স্বামীর মনগড়া অভিযোগে ভুক্তভোগী নারী ও তাঁর বৃদ্ধ বাবাকে থানায় ডেকে এনে পুলিশি হয়রানি করা স্পষ্টতই আইনবহির্ভূত। এর ওপর পুলিশের সোর্স বা ফর্মা কর্তৃক গণমাধ্যমকর্মীকে হুমকি দেওয়ার ঘটনাটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। অনতিবিলম্বে এই অসহায় পরিবারটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এই ঘটনার নেপথ্যের পুলিশ-সোর্স সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা পুলিশ সুপারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন মহল।
রাশেদুল আলম মামুনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি থানায় অভিযোগ করেছি, আমি তাকে ফিরিয়ে আনতে চাই।







