সিদ্ধিরগঞ্জে বেপরোয়া ইকবালকে থামাবে কে?

থামছেনা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী, দখলবাজী

191
সিদ্ধিরগঞ্জে বেপরোয়া ইকবালকে থামাবে কে? থামছে না চাঁদাবাজি-দখল
সিদ্ধিরগঞ্জে বেপরোয়া ইকবালকে থামাবে কে? থামছে না চাঁদাবাজি-দখল

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সিদ্ধিরগঞ্জের ২নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ইকবাল হোসেনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এক সময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ও সমর্থন পেলেও বর্তমানে তার বিরুদ্ধে একের পর এক দখল, চাঁদাবাজি, হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সামনে আসায় জনমনে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জসহ পুরো নারায়ণগঞ্জ জুড়েই এখন প্রশ্ন উঠছে ইকবালকে থামাবে কে?

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘদিন ধরেই ইকবাল হোসেন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বিএনপির নেতাকর্মীরা নানা ধরনের রাজনৈতিক চাপ ও নির্যাতনের মুখে থাকায় একজন বিরোধী দলের নেতা হিসেবে ইকবালও অনেকের সহানুভূতি অর্জন করেন। সেই রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি একাধিকবার ২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।

তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে বরাবরই তার বিরুদ্ধে নানা বিতর্ক ও অভিযোগ ছিল বলে দাবি স্থানীয়দের। অভিযোগ রয়েছে, তিনি একইসঙ্গে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও আলোচিত সাত খুন মামলার অন্যতম আসামি নূর হোসেন এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী গডফাদার সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। এ কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও তিনি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে স্থানীয় মহলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।

এছাড়া নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের ঘটনার পর ইকবালের নাম নিয়েও নানা অভিযোগ উঠেছিল। মামলার প্রাথমিক পর্যায়ে তাকে আসামি করা হলেও পরবর্তীতে তিনি মামলা থেকে অব্যাহতি পান। তবে নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, ওই হত্যাকাণ্ডের পেছনের ঘটনাপ্রবাহে ইকবালের ভূমিকা নিয়ে তাদের প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে।

স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইকবালের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকলেও তিনি তুলনামূলকভাবে সতর্কতার সঙ্গে চলতেন। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার আচরণ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় জমি দখলের চেষ্টা, ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, সাধারণ মানুষকে মারধর এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ক্রমাগত বাড়ছে।

সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ২ নং ওয়ার্ড সচিবকে তার বাড়ির সামনে দলবল নিয়ে হুমকি ও গালাগালের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। যেখানে ইকবালকে বলতে শোনা যায়, তোর কোন বাবায় ঠেকাইবো খা*** পো**, তোর কোন বাবায় ঠেকাইবো। যা ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

এর আগে, ০৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে তার অপকর্মের বিরুদ্ধে মিনহাজ নামে এক সাংবাদিক প্রতিবাদ করলে ওই সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলে বিএনপি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। কিন্তু সেই বহিষ্কারাদেশও তার কর্মকাণ্ডে কোনো প্রভাব ফেলেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সিদ্ধিরগঞ্জের একাধিক বাসিন্দার দাবি, বর্তমানে ইকবালের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী বাহিনী গড়ে উঠেছে, যার মাধ্যমে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করা হচ্ছে। কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পান না বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেকেই তাকে এখন সিদ্ধিরগঞ্জের নতুন গডফাদার হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

পরে গত বছরের নভেম্বরে তার বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার হলে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে ইকবাল। সম্প্রতি জেলার পরিচিত চৌরঙ্গী গ্রুপের মালিক ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ইকবালের বিরুদ্ধে জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ আনেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, প্রভাব খাটিয়ে তার সম্পত্তি দখলের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে এবং এ ঘটনায় তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ওয়ার্ড সচিবকে গালাগাল ও হুমকির ঐ ভিডিও। যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই ঘটনায় বাড়ির বাসিন্দাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, কোনো ব্যক্তি যদি রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক প্রভাব কিংবা বাহুবলের জোরে আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন, তাহলে তা শুধু একটি এলাকার জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যই বিপজ্জনক বার্তা বহন করে।

তাদের মতে, ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একবার বহিষ্কার হওয়ার পরও শিক্ষা হয়নি ইকবালের। সে এখনও প্রকাশ্যে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে নানা অপকর্ম করছেন? তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সিদ্ধিরগঞ্জে দখল, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।

সিদ্ধিরগঞ্জের সাধারণ মানুষের মুখে এখন একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে বিতর্ক, অভিযোগ ও আতঙ্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ইকবাল হোসেনকে থামাবে কে? নাকি দখল, ভয়ভীতি ও প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি চলতেই থাকবে?