
নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলও সবার জানা। কিন্তু এই নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ফতুল্লা থানা বিএনপির রাজনীতিতে এখন এক বড় ধরণের অস্থিরতা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত ভুল আর দলের রহস্যজনক সিদ্ধান্তের খেসারত কি এখন তৃণমূলের সাধারণ কর্মীদের দিতে হচ্ছে? ফতুল্লা বিএনপির যে অর্ধশতাধিক সক্রিয় নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন কী?
ফতুল্লা-সদর (নারায়ণগঞ্জ-৪) আসনে এক সময় দাপটের সাথে রাজনীতি করতেন জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম, সাবেক এমপি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন এবং বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচিত বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে তারা এই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন।
নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, এই নেতারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। হরিণ প্রতীকের শাহ আলম, ফুটবল প্রতীকের গিয়াস উদ্দিন এবং রিপাবলিকান পার্টির হয়ে লড়া মোহাম্মদ আলীর ভোট সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। এমনকি গিয়াস উদ্দিন ও মোহাম্মদ আলীর মতো নেতারা তাদের জামানত পর্যন্ত বাঁচাতে পারেননি। সাধারণ কর্মীদের মতে, এই নেতাদের জেদ আর ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই আজ ফতুল্লা বিএনপির এই বেহাল দশা। বড় নেতারা নিজেদের স্বার্থে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন, আর তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে আজ দলছাড়া হতে হয়েছে শত শত মাঠপর্যায়ের কর্মীদের।
ফতুল্লার রাজনীতিতে দেখা গেছে, তৃণমূলের কর্মীরা সবসময় তাদের শীর্ষ নেতাদের অনুসরণ করেন। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আর নেতাদের নির্দেশে ফতুল্লা থানা বিএনপির সহ-সভাপতি সুলতান মাহমুদ মোল্লা, সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান আলী, যুগ্ম সম্পাদক আক্তার খন্দকারসহ অনেক নেতা বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করেছেন।
নির্বাচন শেষে দল থেকে যখন গণবহিষ্কারের খড়গ নামলো, তখন দেখা গেল ফতুল্লার অন্তত ৫০ থেকে ৬০ জন নেতাকর্মী বহিষ্কৃত হয়েছেন। ফতুল্লা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে। সাধারণ কর্মীরা এখন বলছেন, “বড় নেতারা ভুল করলেন, আর শাস্তি পাচ্ছি আমরা। আমরা তো নেতাদের ভালোবাসতাম বলেই তাদের সাথে ছিলাম। এখন নেতারা যার যার ঘরে বসে আছেন, কিন্তু আমাদের রাজনীতির পথ তো বন্ধ হয়ে গেল।” একেই বলা হচ্ছে তৃণমূলকে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফতুল্লা বিএনপির এই সংকটের পেছনে কেবল বিদ্রোহী নেতাদেরই দোষ নেই, খোদ দলের (বিএনপি) সিদ্ধান্তের দিকেও আঙুল তোলা যায়। নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ প্রশ্ন তুলছেন— বিএনপি কেন ফতুল্লা তথা নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে তাদের দলীয় কোনো প্রার্থী দিল না?
যদি এই আসনে ধানের শীষ প্রতীকের একজন শক্তিশালী প্রার্থী থাকত, তবে তৃণমূলের কর্মীরা কখনোই বিদ্রোহী নেতাদের পেছনে ছুটত না। দল কোনো প্রার্থী না দিয়ে মাঠ ফাঁকা রাখায় কর্মীরা চরম বিভ্রান্তিতে পড়েছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, নিজেদের ঘর ঠিক রাখতে হয়তো এলাকার পরিচিত বড় নেতাদের সমর্থন দেওয়া দরকার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলের এই ‘অস্পষ্ট’ কৌশলের কারণেই তৃণমূলের কর্মীরা ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। দল সময়মতো কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় আজ ফতুল্লা বিএনপি দুই-তিন ভাগে ভাগ হয়ে গেছে।
বহিষ্কৃত হওয়া অনেক নেতাকর্মী আশা করেছিলেন, তাদের প্রার্থী জয়ী হলে তারা আবার বীরদর্পে দলে ফিরে আসবেন। কিন্তু পরাজয়ের পর সেই আশা এখন নিরাশায় পরিণত হয়েছে। যারা বছরের পর বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করে দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, আজ দল থেকে বহিষ্কার হওয়ায় তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার হুমকির মুখে।
ফতুল্লা বিএনপির অনেক সমর্থক মনে করেন, বড় নেতাদের ইগো আর কেন্দ্রের ভুল কৌশলের কারণেই আজ মাঠের কর্মীরা বিপদে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দল কি এই ত্যাগী কর্মীদের কথা ভেবে তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করবে? নাকি নেতাদের ভুলের দায় সারাজীবন এই কর্মীদেরই বয়ে বেড়াতে হবে?
ফতুল্লা বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতি বলে দিচ্ছে যে, কোনো সমন্বয় নেই। একদিকে নেতাদের বিদ্রোহী হওয়ার ভুল সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে দলের প্রার্থী না দেওয়ার ‘রহস্য’। এই দুইয়ের চাপে পিষ্ট হয়ে ফতুল্লা বিএনপির রাজনীতি এখন অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা এখন শুধু দল থেকে ক্ষমা আর পুনর্বাসনের অপেক্ষা করছেন।







