
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৩ ডিসেম্বর সাংবাদিক পেটানোর গুরুতর ঘটনায় দল থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন। পরবর্তীতে গত বছরের নভেম্বরে আবেদনের প্রেক্ষিতে তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয় দল। তবে দল থেকে ছাড় পাওয়ার পর আইনি ও রাজনৈতিকভাবে সুধরে যাওয়ার পরিবর্তে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। ল্যান্ড বিজনেসের আড়ালে জমি দখল, কিশোর গ্যাংয়ের শেল্টার দেওয়া এবং এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তারের পর এবার সাইনবোর্ডের মিতালী মার্কেট সংলগ্ন কোটি কোটি টাকার পৈত্রিক সম্পত্তি জবরদখল চেষ্টার নেপথ্যে কারিগর হিসেবে অভিযোগ উঠেছে এই বিতর্কিত নেতার বিরুদ্ধে।
স্থানীয়রা জানায়, নিজে পর্দার আড়ালে থেকে পুরো ঘটনার মূল কলকাঠি নাড়ছেন এই প্রভাবশালী নেতা, আর মাঠে থেকে জমি দখলের মিশন বাস্তবায়ন করছেন তারই আপন বোনজামাই মুক্তার হোসেন, যিনি এই ঘটনায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় দায়ের করা লিখিত অভিযোগের ১১ নম্বর বিবাদী। গত ২৭ মে সকালে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে একদল লোক মিতালী মার্কেট কমিটির ব্যানারে এই জমি দখলের চেষ্টা চালায় বলে ভুক্তভোগীদের দাবি। এই বিষয়ে মুখোমুখি হলে নিজেকে ধোঁয়া তুলসী পাতা দাবি করে সংবাদমাধ্যমের ওপর চরম ক্ষোভ ঝেড়েছেন এবং নানা চাঞ্চল্যকর যুক্তি দিয়েছেন ইকবাল হোসেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী জানান, বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হওয়ার পর এলাকায় যেন আলাদিনের চেরাগ পেয়েছেন ইকবাল। ল্যান্ড বিজনেসের আড়ালে সাধারণ মানুষের জমি দখল, নালিশা সম্পত্তি জিম্মি করা এবং নিজস্ব কিশোর গ্যাং বাহিনী দিয়ে এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে চলেছেন তিনি।
ভুক্তভোগী কাজী তানভীর ইসলাম ও তার চাচা কাজী আঃ সাত্তার জানান, সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন খোদ্দুঘোষ মৌজার আরএস বিভিন্ন দাগের ৯৩ শতাংশ ৬৬ পয়েন্ট জমি পৈত্রিক ও ওয়ারিশ সূত্রে তারা মালিক। সেখানে তারা বহুতল ইমারত নির্মাণ করে শান্তিপূর্ণভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। কিন্তু এই জমির ওপর দীর্ঘদিন ধরে লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে সাইনবোর্ড মিতালী মার্কেট কমিটির পেছনে থাকা সিন্ডিকেটের। রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেনের আপন বোনজামাই মুক্তার হোসেনকে (অভিযোগের ১১ নং বিবাদী) সামনে এগিয়ে দেওয়া হয়। গত ২৭ মে সকাল ৭টার দিকে ওই চক্রের প্রত্যক্ষ মদদে ২০/২৫ জনের একটি সশস্ত্র দল রামদা, চাপাতি, লোহার রড ও সাবল নিয়ে মিতালী মার্কেট সংলগ্ন উক্ত জমিতে অনধিকার প্রবেশ করে টিনের বেড়া দেওয়ার চেষ্টা করে। মালিকপক্ষ বাধা দিলে তারা বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতিসহ প্রাণনাশের হুমকি দেয়।
এলাকায় আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠার বিষয়ে জানতে চেয়ে ইকবাল হোসেনকে প্রশ্ন করা হয়, “আপনি এলাকায় আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এমনটি জানায় এলাকাবাসী, এই বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?” এমন প্রশ্নে রীতিমতো তাচ্ছিল্য ও ক্ষোভ প্রকাশ করে পাল্টা কামড় দিয়ে ইকবাল হোসেন বলেন, “আমি তো সন্ত্রাসী কার্যক্রম করেই বেড়াই, আপনাদের কথায় তাই মনে হয়।”
না, এলাকাবাসী বলছে ল্যান্ড বিজনেসের আড়ালে জমি দখলসহ নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছেন আপনি—প্রতিবেদকের এই সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, “যারা অভিযোগ করে তাদের বলেন প্রমাণ দিতে।”
মিতালী মার্কেটের পিছনের জায়গা দখলে আপনার হাত রয়েছে বলে ভুক্তভোগীসহ স্থানীয়রা সরাসরি অভিযোগ তুলছেন—এর উত্তরে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে তিনি বলেন, “আমার কোনো হাত নেই। নিউজ করলেই তো আর হলো না। আমি সেখানে গিয়েছি এমন কেউ বলতে পারবে? বা এমন কোনো ফুটেজ কি আছে? শুধু শুধুই আমার নামে নিউজ করা হচ্ছে। একটি পক্ষ আমার কাছে কাগজপত্র নিয়ে এসেছে, আমি বলেছি আইনের দ্বারস্থ হন।”
আমাদের প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হয়, তাহলে আপনার আপন বোনজামাতাকে (মুক্তার হোসেন) যে এই ঘটনায় ১১ নম্বর অভিযুক্ত বা বিবাদী করা হলো? এর জবাবে বোনজামাইয়ের পক্ষে একপ্রকার সাফাই গেয়ে বিএনপি নেতা ইকবাল হোসেন বলেন, “অভিযোগ হতেই পারে, কিন্তু সেও জড়িত না, সে ওখানে যায়নি।”
অথচ এর আগে এই জমি দখলের বিষয়ে প্রতিবেদকের প্রথম প্রশ্নের জবাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেছিলেন, “জমি দখল কাকে বলে? যার জমি সে বাউন্ডারি দিতে গেলে কি জমি দখল হয়?” এবং নিজের রিয়েল এস্টেট ব্যবসার দাপট দেখিয়ে বলেছিলেন, “আমি তো ভাই ল্যান্ডের ব্যবসা করি ২০০২ সাল থেকে। ৪ হাজারেরও অধিক প্লট বিক্রি করেছি। কিছু তো বুঝি।” কিন্তু যখনই তার বোনজামাইয়ের নাম ১১ নম্বর বিবাদী হিসেবে সামনে আসে এবং মিতালী মার্কেটের জমি দখলের নালিশ ওঠে, তখনই তিনি ভোল বদলে দাবি করছেন যে তিনি বা তার বোনজামাই এর সাথে জড়িতই নন।
এই ঘটনায় কাজী তানভীর ইসলাম বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ২০/২৫ জনের বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এই বিষয়ে জানতে চাইলে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় নি।







