জুলাইয়ের রক্তে লেখা নতুন স্বাধীনতার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হবে তো?

13
জুলাইয়ের রক্তে লেখা নতুন স্বাধীনতার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হবে তো?
জুলাইয়ের রক্তে লেখা নতুন স্বাধীনতার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হবে তো?

রফিকুল ইসলাম জীবন:

স্বাধীনতা কেবল একটি পতাকা, একটি মানচিত্র কিংবা একটি ভূখণ্ডের নাম নয়। স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন একটি দেশের মানুষ নির্ভয়ে নিজের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে, নিজের মত প্রকাশ করতে পারে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা পায়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে অনেকের মূল্যায়ন—১৯৭১ সালে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ সব সময় নিশ্চিত করা যায়নি। তাঁদের ভাষায়, কেবল ভূখণ্ডগত স্বাধীনতা কোনো প্রকৃত স্বাধীনতা নয়। প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন জনগণের ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার বাস্তবে সুরক্ষিত থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। অনেকের মতে, জুলাই ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়; এটি ছিল মানুষের হারিয়ে যাওয়া অধিকার পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। এমন একটি সংগ্রাম, যেখানে তরুণেরা বুক পেতে দিয়েছে, ছাত্ররা রক্ত দিয়েছে, সাধারণ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছে একটি অধিকতর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্নে।

জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ কোনো দল, গোষ্ঠী বা সরকারের সম্পদ নয়; এটি পুরো জাতির বিবেক। তাঁদের রক্তে রঞ্জিত রাজপথ আজও যেন প্রশ্ন করে—এই আত্মত্যাগ কি কেবল ক্ষমতার পালাবদলের জন্য ছিল, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র গড়ার জন্য, যেখানে মানুষের ভোট কখনো ছিনিয়ে নেওয়া হবে না, ভিন্নমতকে কখনো দমন করা হবে না এবং রাষ্ট্রের মালিক হবে জনগণ?

অনেক বিশ্লেষকের মতে, জুলাই আন্দোলন অন্তত দ্বিতীয়বারের মতো এ দেশের মানুষের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের আশা সৃষ্টি করেছে। এই আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল জনগণের ক্ষমতা জনগণের কাছেই ফিরিয়ে দেওয়া। তাই যাঁরা ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন না, তাঁদের কর্মকাণ্ডকে জুলাইয়ের চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন অনেকে।

ইতিহাস সাক্ষী, শহীদদের রক্তের সঙ্গে কখনো প্রতারণা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। যে জাতি তার শহীদদের ভুলে যায়, সে জাতি নিজের ভবিষ্যৎও হারিয়ে ফেলে। তাই জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণ মানে শুধু ফুল দেওয়া নয়; তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা। এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে ভোট হবে জনগণের অবিচ্ছেদ্য অধিকার, মতপ্রকাশ হবে নির্ভয়ের এবং রাষ্ট্র হবে জবাবদিহিমূলক।

আজ জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে জাতির সামনে একটি প্রশ্ন রয়ে যায়—আমরা কি তাঁদের সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি? নাকি এখনো সেই স্বপ্ন অপূর্ণ?

জুলাইয়ের শহীদদের রক্ত যেন কখনো ক্ষমতার অলংকারে পরিণত না হয়। তাঁদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মর্যাদা তখনই রক্ষা পাবে, যখন স্বাধীনতার অর্থ কেবল মানচিত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং প্রতিটি নাগরিকের ভোট, মতপ্রকাশ, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদার মধ্যে প্রতিদিন প্রতিফলিত হবে।