নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে আলোচনায় এমপি পুত্র ও দাপুটে ৭ নেতা

কঠোর হবেন তারেক রহমান প্রত্যাশা জনগনের

462

নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর-বন্দর) আসনে চতুর্থবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। তবে তাঁর এই বিজয় শহরবাসীর মনে স্বস্তির পাশাপাশি আতঙ্ক আর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের প্রবল আশঙ্কা, নবনির্বাচিত এমপির পরিবার এবং শহরের প্রভাবশালী সাত নেতার মধ্যে অর্থনৈতিক সেক্টরগুলোর ‘ভাগ-বাটোয়ারা’ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এই শিল্পাঞ্চলে এখন বিএনপির নামে রাঘব বোয়ালদের লড়াই হলে সাধারণ মানুষের প্রাণ ও সম্পদ ঝুঁকির মুখে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।

নবনির্বাচিত এমপি আবুল কালামের পুত্র আবুল কাউসার আশাকে ঘিরে পুরো শহর ও বন্দরে আগে থেকেই নানা রকম নেতিবাঁচক আলোচনা রয়েছে। ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে বন্দরের ঘাট, মাঠ ও বালু মহাল দখলসহ সিমেন্ট ফ্যাক্টরির লোড-আনলোড সেক্টর নিয়ন্ত্রণে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। তার এই সকল কর্মকান্ডকে ‘আজমেরী ওসমানের’ নতুন সংস্করণ হিসেবে মিডিয়ায় প্রচার ও প্রকাশ হয়েছে। বন্দরের দুই খুনের ঘটনায় শেল্টারদাতা হিসেবে তাঁর নাম গণমাধ্যমে আসায় সেই আতঙ্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। এখন উদ্বেগের মূল কারণ হলো-এমপি পদকে ঢাল বানিয়ে আশা ও তাঁর অনুসারীরা যদি জাকির খান বা সাখাওয়াত ইসলাম রানার মতো নেতাদের সেক্টরগুলোতে ‘নতুন করে ভাগ’ বসাতে চান, তবে শহর এক ভয়াবহ সংঘাতের দিকে ধাবিত হবে। মূলত বাবার বয়সের সুযোগ নিয়ে আশাই এখন ‘ছায়া এমপি’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছেন বলে ধারণা অনেকের। তবে এরই মাঝে নানা সমালোচনা এবং তার পিতা বার বার নির্বাচিত এমপি এডভোকেট আবুল কালাম এবারের নির্বাচনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতার মুখে পড়ায় তিনি এখন অনেকটাই নিজেকে সুধরে নিতেও পারেন বলে অনেকে মনে করেন।

শহরের আধিপত্যের লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় শক্তি এখন জাকির খান। দীর্ঘ প্রবাস ও কারাবাস শেষে মুক্তি পাওয়া এই নেতার রয়েছে বিশাল এক অনুসারী বাহিনী। ৫ই আগস্টের পর পরিবহনসহ ফতুল্লা ও শহরের বিভিন্ন খাতের নিয়ন্ত্রণ নিতে তাঁর অনুসারীরা বিতর্কিত সব কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে। ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জাকির খানের ভাই জিকু খান কর্তৃক নিজস্ব লোক জিয়াকে গুলি করার ঘটনা প্রমাণ করে তাঁর বাহিনী কতটা বেপরোয়া। এখন এমপির ছেলে আশার বাহিনী যদি জাকির খানের এই বিশাল সাম্রাজ্যে হস্তক্ষেপ করতে যায়, তবে নারায়ণগঞ্জ ফের সেই নব্বইয়ের দশকের র্দুর্ধষ খুনাখুনির যুগে ফিরে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জাকির খানের ফুপাতো ভাই হিসেবে পরিচিত বদিউজ্জামান বদু ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজনীতি না করার মুচলেকা দিলেও ০৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আবার নিজেকে বিএনপি নেতা হিসেবে জাহির করতে মরিয়া তিনি। এখন তিনি হোসিয়ারি সমিতির সভাপতি এবং পুরো সেক্টরের নিয়ন্ত্রক। সাধারণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, জাকির খান ও বদুর অনুসারীরা নামমাত্র মূল্যে হোসিয়ারি ঝুট নিয়ে যাচ্ছে। এই সেক্টর থেকে সংগৃহীত কাঁচা টাকার ওপর যদি এমপির অনুসারীরা ভাগ বসাতে চায়, তবে তা হবে সংঘাতের অন্যতম বড় কারণ।

মহানগর যুবদল নেতা পরিচয় দেওয়া মাজহারুল ইসলাম জোসেফকে নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। চিহ্নিত অপরাধীদের শেল্টার দেওয়া, দলীয় র‌্যালিতে রক্তক্ষয়ী হামলা এবং অটোরিকশা চালকদের নগর ভবনে হামলার নেপথ্যে তাঁর অনুসারীদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে রাজনৈতিক মহল বেশ সমালোচিত। সমবায় কার্যালয় ও লোড-আনলোড সংগঠনসহ একাধিক সংগঠনের প্রধান চেয়ার দখলে রেখেছেন তিনি। এখন যদি এসব নিয়ে জোসেফের বাহিনী ও এমপির অনুসারীদের মধ্যে নতুন করে দ্বন্দ্বের বীজ অঙ্কুরিত হয় তাহলে নতুন করে সংঘাত-সংঘর্ষের সৃষ্টি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাখাওয়াত ইসলাম রানা ৫ আগষ্টের পর থেকেই পরিবহন সেক্টরে নিজের প্রভাব বজায় রেখেছেন। রুট পারমিট ছাড়াই ‘গ্রিন ঢাকা’ বাস চালানো এবং বন্ধন পরিবহনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জাকির খান বাহিনীর সঙ্গে তাঁর বাহিনীর দফায় দফায় সশস্ত্র সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরিবহন মালিকদের অভিযোগ, সরকারি ক্ষমতার পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে রানা পরিবহন খাতের বড় একটি অংশ নিজের বলয়ে নিয়ে নিয়েছেন।

মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম সজলের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কিল্লারপুলে ড্রেজার পরিদপ্তর ও ডিপিডিসি কার্যালয়ে টেন্ডার কার্যক্রমে অনিয়ম এবং প্রভাব খাটানোর বিষয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া বিসিক ও নবীগঞ্জ ঘাটসহ খানপুর-কিল্লারপুল ও আশেপাশের এলাকার বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের ঝুট সেক্টরে তাঁর অনুসারীদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব শাহেদ আহমেদের বিরুদ্ধেও রয়েছে অভিযোগের দীর্ঘ তালিকা। বিশেষ করে গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের মালামাল পরিবহন ও বিভিন্ন শিল্প কারখানার ঝুট সেক্টরে বিশৃঙ্খলা তৈরির অভিযোগে তাঁর নাম বারবার সামনে এসেছে। স্থানীয়দের মতে, শাহেদ ও তাঁর বাহিনী বিভিন্ন অর্থনৈতিক সেক্টরে নিজেদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। নতুন এমপির অনুসারীরা এই সেক্টরে হাত দিলে নতুন করে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষের বড় উদ্বেগের জায়গা হলো-এতদিন এই সাত নেতা যার যার মতো এলাকা ও সেক্টর ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। কিন্তু এখন ধানের শীষের প্রার্থী আবুল কালাম সরাসরি এমপি হওয়ায় তাঁর ছেলে আবুল কাউসার আশা ও এমপির খাস অনুসারীরা শহরের প্রতিটি বড় অর্থনৈতিক সেক্টরে ‘মাস্টার শেয়ার’ বা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি করতে পারেন।

স্থানীয়রা বলছেন, “নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে দেখা গেছে, যখনই কোনো নতুন শক্তি পুরোনো প্রতিষ্ঠিত শক্তির পকেটগুলোতে হাত দিয়েছে, তখনই লাশ পড়েছে।” নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে নবনির্বাচিত এমপির অনুসারীরা যদি প্রভাবশালী এই সাত নেতার সাথে ‘মালিকানা’ বা ‘ভাগের’ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়, তবে অচিরেই এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে শিল্পাঞ্চলবাসী।

তবে নারায়ণগঞ্জবাসীর মনে আশার আলো জ¦ালিয়ে রেখেছেন খোদ বিএনপির প্রধান তারেক রহমান। তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথমেই দেশের আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রনে হাত দেবেন বলে জানানো হয়েছে। তারেক রহমান কোনো মতেই এই নগরীকে দলের নামে কোনো সন্ত্রাসীদের হাতে ছেড়ে দেবেন না বলে মনে করেন এই জনপদের মানুষ। কেনোনা অতীতেও ২০০১ সালে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর কঠোর হস্তে দেশের আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রন করেছিলেন। তাই নয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জকে কোনো মতেই অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য হতে দেবেন না। ফলে রাজনীতির নামে যেমনি খুশী টাকা কামানোর পথ খোলা নাও থাকতে পারে। কেনোনা তারেক রহমান এরই মাঝে ঘোষনা দিয়েছেন তিনি দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন এবং কঠোর হাতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন।