“ইজিবাইক চালকদের ধরলে, হকার উচ্ছেদ করলে ছিনতাই বাড়বে” – এসপির বক্তব্যে সমালোচনার ঝড়

54
নারায়ণগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদারের এক মন্তব্য নিয়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
এসপি প্রত্যুষ কুমার মজুমদার, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি, নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি, নারায়ণগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আহসান সাদিক শাওন, এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ও জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক আহমেদুর রহমান তনু ।

নারায়ণগঞ্জের যানজট নিরসনে নিজেদের ব্যর্থতার দায় এড়াতে পুলিশ সুপার (এসপি) প্রত্যুষ কুমার মজুমদার এক ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ ও ‘অযৌক্তিক’ মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ তুলেছে সুশীল সমাজ।

বিশেষত, “কঠোরভাবে ইজিবাইক ডাম্পিং করলে, তাদের ধরলে শহরে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ বেড়ে যেতে পারে,” এসপির এমন বক্তব্যে নগরজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

শনিবার (৯ আগস্ট) জেলা দোকান মালিক সমিতির এক অনুষ্ঠানে যানজট প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে পুলিশ সুপার এই বিতর্কিত মন্তব্য করেন। এর ফলে, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি থেকে শুরু করে সাংবাদিক নেতারাও এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

এসপির যে বক্তব্যে বিতর্ক

অনুষ্ঠানে এসপি প্রত্যুষ কুমার বলেন, “এই শহরের রাস্তা হয়তো ৫ হাজার ইজিবাইকের ভার নিতে পারে, কিন্তু চলে লাখ লাখ। ০৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে অনেকে পালিয়ে গেছে, তাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকরা চাকরি হারিয়ে আর গ্রামে ফিরতে পারেনি। তার পর দিন একটা ইজিবাইক নিয়ে এই শহরের রাস্তায় নেমে পড়েছে। আমরা পারি তাদেরকে ডাম্পিং করতে, তাদেরকে ধরতে। কিন্তু, আমি যখন একজন ইজিবাইক চালককে দুই দিনের জন্য ধরে রাখব, তখন তার পরিবার না খেয়ে থাকবে।” এরপরই তিনি বলেন, “পেটের দায়ে, তার বউ বাচ্চার মুখে অন্ন তুলে দেয়ার জন্য, সে হয়তো কম দামে একটি চাকু কিনে/সুইস গিয়ার কিনে আপনার কাছ থেকেই টাকা ছিনিয়ে নেবে। এতে শহরে ছিনতাই বাড়বে।” আমরা চাইলেই কিন্তু সবকিছু একবারে বন্ধ করতে পারবো না। আমরা যে যেখানে আছি, পর্যায়ক্রমে যার যার অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে। 

এটিই প্রথম নয়, এর আগেও গত ৩০ জানুয়ারি জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে আয়োজিত এক সভায় তিনি হকার উচ্ছেদ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, হকারদের উচ্ছেদ করলে পরদিন থেকে তারা মানুষের ভ্যানিটি ব্যাগ কেড়ে নিতে চাইবে, না দিলে স্টেপিং (ছুরিকাঘাত) করবে, যাতে করে শহরে ছিনতাই বাড়িয়ে দেবে।

তীব্র প্রতিক্রিয়া জানালেন বিশিষ্টজনেরা

এসপির এই বক্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন আখ্যা দিয়ে এর তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশিষ্টজনেরা।

  • সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেন, “একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা কোনোভাবেই এই ধরনের বক্তব্য দিতে পারে না। তার ব্যর্থতা ঢাকার জন্যই এ সমস্ত কথাবার্তা বলে তারা।”

  • এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ও জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক আহমেদুর রহমান তনু বলেন, “পুলিশ সুপারের এই বক্তব্য একেবারেই যুক্তিসংগত নয়। তার বলা দরকার ছিলো যে, পুরো ম্যানেজমেন্টকে স্ট্রং করতে হবে এবং অবৈধ অটোর প্রবেশ ঠেকাতে প্রয়োজনে ডাম্পিংয়ে যেতে হবে।”

  • নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি বলেন, “পুলিশ সুপারের এই অজুহাতটা সঠিক না। এটি অপরাধীদের উৎসাহিত করবে। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পেশা পরিবর্তন হলেই অপরাধী হয়ে যাবে, এইটা বাস্তবতা না। অপরাধীদের অপরাধী হিসেবেই ট্রিট করতে হবে। পুলিশের কাজ আইনের প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।” তার ফলে সমাজে কোনো পরিবর্ত আসবে কিনা সেটা সমাজ বিজ্ঞানীদের কাজ। তিনি আরও বলেন, “তার বক্তব্যে শুনে মনে হয়, অটোওয়ালাদের/হকারদের কাছে আমরা জিম্মি কিনা?”

  • নারায়ণগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আহসান সাদিক শাওন বলেন, “এটা দায়িত্বশীল কথা নয়, তার এই বক্তব্য আমাদের হতাশ করে। জেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান হিসেবে তার কাছ থেকে এই ধরনের বক্তব্য কাম্য না। আমরা তার কাছে জেলার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাশা করি।”

হতাশা নগরবাসী ও পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, যানজট একটি কাঠামোগত সমস্যা, যার সমাধানে সমন্বিত পরিকল্পনা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন।

কিন্তু, প্রশাসনের শীর্ষ কর্তা আইন প্রয়োগের আগেই এমন দুর্বল অজুহাত দিলে অবৈধ যান ও হকার নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে, সাধারণ নগরবাসীর মধ্যেও এসপির বক্তব্যে তীব্র হতাশা তৈরি হয়েছে।

তাদের মতে, যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কর্মসময় নষ্ট হচ্ছে। অথচ, কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো অপরাধ বাড়ার ভয় দেখানো হচ্ছে।

এটি আইন প্রয়োগে প্রশাসনের দুর্বলতা এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডকে পরোক্ষ স্বীকৃতি দেওয়ার সামিল বলে তারা মনে করছেন।

সব মিলিয়ে, পুলিশ সুপারের এই ব্যাখ্যা যানজট সমস্যায় জর্জরিত নগরবাসীর কাছে দায়িত্ব এড়ানোর কৌশল হিসেবেই প্রতিভাত হয়েছে, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দক্ষতার প্রতি জনমনে গভীর প্রশ্ন তৈরি করছে।