
দেশের অন্যতম শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি হার্ট সেন্টার। শহরের প্রাণকেন্দ্রে একটি পরিত্যক্ত বহুতল ভবন (যা পূর্বে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট হওয়ার কথা ছিল) দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, মুমূর্ষু হৃদরোগীদের জীবন বাঁচাতে দ্রুত এই ভবনটিকে আধুনিক হার্ট সেন্টারে রূপান্তরিত করা হোক। বর্তমানে জেলায় হৃদরোগ চিকিৎসার যে অপ্রতুল ব্যবস্থা রয়েছে, তা জরুরি পরিস্থিতিতে একেবারেই যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও চিকিৎসকরা।
চিকিৎসকদের মতে, হার্ট অ্যাটাকের পর প্রথম এক ঘণ্টা, যা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ নামে পরিচিত, রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে পূর্ণাঙ্গ কার্ডিয়াক ইউনিট না থাকায় রোগীদের বাধ্য হয়ে ঢাকায় রেফার করা হয়। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের তীব্র যানজট পেরিয়ে বিশেষায়িত হাসপাতালে পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যায়, যার ফলে পথেই অনেক রোগীর করুণ মৃত্যু ঘটে। এই অকাল মৃত্যু রোধে নারায়ণগঞ্জের ভেতরেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন হার্ট সেন্টার স্থাপন এখন সময়ের দাবি।
জেলায় বর্তমানে ‘ইসলাম হার্ট সেন্টার’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থাকলেও আধুনিক সরঞ্জাম এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তা পর্যাপ্ত সেবা দিতে পারছে না। জরুরি এনজিওগ্রাম, বাইপাস সার্জারি বা পূর্ণাঙ্গ সিসিইউ (ঈঈট) সেবার অভাবে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে যেমন সিট পাওয়া কঠিন, তেমনি সেখানকার চিকিৎসা ব্যয়ও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত যে বহুতল ভবনটি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট হিসেবে বরাদ্দ ছিল, সেটি এখনও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। সচেতন নাগরিক সমাজের অভিমত, মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসায় এই ভবনটিই সর্বোত্তম বিকল্প হতে পারে। নতুন ভবন নির্মাণের দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে দ্রুত এই ভবনে সেবা চালু করা সম্ভব। শহরের কেন্দ্রে হওয়ায় জেলার যেকোনো প্রান্ত থেকে রোগীরা দ্রুত এখানে পৌঁছাতে পারবেন। এছাড়াও, সরকারি এই অবকাঠামো ব্যবহার করলে কয়েকশ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
নারায়ণগঞ্জের নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটির প্রতিনিধিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “আমাদের সম্পদ আছে কিন্তু সদিচ্ছার অভাবে মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে।”
সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি নারায়ণগঞ্জে একটি পূর্ণাঙ্গ হার্ট সেন্টারের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “নারায়ণগঞ্জে হার্ট সেন্টারের প্রয়োজনীয়তা বলে শেষ করা যাবে না।” তিনি এই জনবহুল শিল্পাঞ্চলে এমন একটি চিকিৎসা কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তাকে “অপরিসীম” বলে উল্লেখ করেন। রাব্বি আরও জানান যে, এই পরিত্যক্ত কোর্ট ভবনটিকে স্বাস্থ্যসেবা, উচ্চশিক্ষা অথবা জনস্বার্থে অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যবহারের জন্য তার সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “যদি পূর্ণাঙ্গ সেন্টার নাও হয়, অন্ততপক্ষে হৃদরোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।”
চিকিৎসকদের মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যাথ-ল্যাব ও সিসিইউ সমৃদ্ধ সেন্টার এখানে থাকলে মৃত্যুর হার অর্ধেক কমিয়ে আনা সম্ভব।
সিভিল সার্জন এ এফ এম মশিউর রহমানও নারায়ণগঞ্জে একটি হার্ট সেন্টারের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত পোষণ করেন। তিনি অকপটে স্বীকার করে বলেন, “নারায়ণগঞ্জে হার্ট সেন্টার অতীব প্রয়োজনীয়।” তবে, একই সাথে তিনি গভীর হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, “দুঃখের বিষয় হলো আমরা এখনো নারায়ণগঞ্জে একটি মেডিকেল কলেজই স্থাপন করতে পারলাম না।” সিভিল সার্জন মনে করেন, “আসলে পলিটিক্যাল গভর্নমেন্ট ছাড়া এসব কাজ সম্ভব না।” তিনি বিগত সরকারের আমলের উদাহরণ টেনে বলেন যে, তৎকালীন তিন এমপি শামীম ওসমান, বাবু ও গোলাম দস্তগীরের ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা এবং টানাপোড়েনের কারণেই নারায়ণগঞ্জের জন্য বরাদ্দ মেডিকেল কলেজ প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত মুন্সীগঞ্জে স্থানান্তরিত হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সরকার অবিলম্বে এই অব্যবহৃত ভবনটিকে একটি আধুনিক হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে রূপান্তর করবে। নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষ মনে করে, মানুষের জীবনের বিনিময়ে আর কোনো কালক্ষেপণ সহ্য করা হবে না।







