১৮৫ কোটির উন্নয়ন না কি মরণফাঁদ? ‘ডেডলক’ হওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জ

টার্মিনাল দরকার কিন্তু শহরের নাভিতে নয়, স্থানান্তর চাই”- সাবেক কাউন্সিলর খোরশেদ

3

নারায়ণগঞ্জের প্রাণকেন্দ্র খানপুরে ১৮৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার এবং বাল্ক টার্মিনাল নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য এখন মূর্তমান এক ‘মরণফাঁদ’। ১৮৫ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে বড় আশার কথা বললেও এর ভৌগোলিক অবস্থান পুরো নগরীকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবাদীদের দাবি—যে শহর এখনই হকার, অবৈধ স্ট্যান্ড এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ভার সইতে পারছে না, সেখানে এই দানবীয় টার্মিনাল স্থাপন করা হলে নারায়ণগঞ্জ এক ভয়াবহ ‘ডেডলক’-এ পরিণত হবে। উন্নয়নকে স্বাগত জানালেও, ঘনবসতিপূর্ণ শহরের ‘হৃদপিণ্ড’ খানপুর থেকে এই প্রকল্পটি দ্রুত জনশূন্য অন্য কোনো সুবিধাজনক স্থানে সরিয়ে নেওয়ার দাবি এখন তুঙ্গে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহর ইতিমধ্যেই ৪টি প্রধান সমস্যায় জর্জরিত, যার সাথে নতুন টার্মিনাল যুক্ত হলে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। প্রথমত, বর্তমানে চাষাঢ়া, ২নং রেল গেট, কালীবাজার এবং নিতাইগঞ্জ মোড়ে অসংখ্য অবৈধ সিএনজি, অটো এবং লেগুনা স্ট্যান্ড পুরো সড়ক দখল করে রেখেছে। এমনকি বঙ্গবন্ধু সড়কের নিতাইগঞ্জ থেকে মণ্ডলপাড়া পর্যন্ত সড়কের অর্ধেকটা জুড়ে সারাক্ষণ ট্রাক পার্কিং করা থাকে। চাষাঢ়া পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে ব্যক্তিগত গাড়ির অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে যাতায়াত এমনিতেই বিঘ্নিত। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে প্রতিদিন শত শত কন্টেইনারবাহী লরি ঢুকলে পুরো শহর ২৪ ঘণ্টা স্থবির হয়ে থাকবে।

দ্বিতীয়ত, শহরের ফুটপাতগুলো এখন হকারদের দখলে। ফলে পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। বর্তমান অবস্থায় হকার আর ইজিবাইকের ভিড়ে পথচারীরা যে ঝুঁকির মধ্যে আছেন, কন্টেইনারবাহী ট্রেইলর চলাচল শুরু করলে সেই ঝুঁকি সরাসরি ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হবে। সরু রাস্তায় বিশাল লরির নিচে পথচারী পিষ্ট হওয়ার ঘটনা নিত্যদিনের বিষয়ে পরিণত হবে।

তৃতীয়ত, উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় হাজার হাজার অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মিশুক শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা এই ক্ষুদ্র যানবাহনগুলো যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করায় এমনিতেই যানজট তীব্র। এই অটোরিকশার সাথে বিশাল কন্টেইনার লরির সংঘাত শহরটিকে একটি বিশৃঙ্খল রণক্ষেত্রে পরিণত করবে।

চতুর্থত, শহরের প্রধান সড়কগুলোতে অবৈধ পার্কিং এবং ড্রেনেজ সংস্কারের ধীরগতি যানজটকে আরও উসকে দিচ্ছে। প্রশাসনের নানা উদ্যোগ থাকলেও তা বাস্তবায়নে ঘাটতির কারণে জনভোগান্তি কমছে না। নাগরিক সমাজ মনে করেন, যে প্রশাসন বর্তমানের ইজিবাইক আর হকার জট সামলাতে পারছে না, তারা কন্টেইনার লরির চাপ সামলাবে—এমনটা ভাবা অবাস্তব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো ভয়াবহ যানজট। খানপুর এলাকাটি শহরের মূল কেন্দ্রের অত্যন্ত কাছে হওয়ায় এই ভারী যানবাহনগুলো যখন চাষাড়া বা লিংক রোড দিয়ে ঢুকবে, তখন সাধারণ মানুষের চলাচল স্থবির হয়ে যাবে। নারায়ণগঞ্জের ভেতরের রাস্তাগুলো বড়জোর ১০-১৫ টনের ভার সইতে পারে, সেখানে ৪০-৫০ টন ওজনের লরি চলাচল করলে রাস্তা দ্রুত দেবে যাবে এবং ভূগর্ভস্থ গ্যাস ও পানির পাইপলাইন ফেটে বড় ধরণের বিপর্যয় ঘটবে।

এর বাইরে ‘বাল্ক টার্মিনাল’ অংশটি জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি। কয়লা, বালু বা সিমেন্টের মতো পণ্য খোলা অবস্থায় খালাস করা হলে বিষাক্ত ধূলিকণা বাতাসের সাথে মিশে ক্যানসার, অ্যাজমা ও ফুসফুসের মরণব্যাধি ছড়িয়ে দেবে। বিশেষ করে খানপুর টার্মিনালের পাশেই অবস্থিত ‘৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল’ ও সংলগ্ন আবাসিক এলাকার মানুষের জীবন বিপন্ন হবে।

এই প্রকল্পের ভয়াবহতা নিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান প্রশাসনের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত সিইও এবং সচিব নূর কুতুবুল আলম এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা এই বিষয়ে আমাদের নাগরিকদের মতামত এবং আমাদের পর্যবেক্ষণ লিখিত আকারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে গত বছরই পাঠিয়েছি। কিন্তু দুঃখজনক হলো, আমাদের সেই পর্যবেক্ষণ এবং নগরবাসীর শঙ্কাকে আমলে না নিয়েই প্রকল্পটি নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।”

তিনি আরও বলেন, “প্রকল্পটি যে এই স্থানে আত্মঘাতী হবে, তা আমরা বারবার বলেছি। তারপরও নগরবাসীর স্বার্থ রক্ষার কথা চিন্তা করে আমাদের প্রশাসক স্যার দেশে আসা মাত্রই এই বিষয়ে আমরা তার সাথে কথা বলে বিস্তারিত জানাবো। আমাদের বর্তমান প্রশাসক স্যার এখন দেশের বাইরে আছেন। তিনি ফিরলেই এই প্রকল্পের নেতিবাচক প্রভাবগুলো আবারও সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তুলে ধরার বিষয়ে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবো।”

উল্লেখ্য যে, গত বছরের ২৭ জানুয়ারি সিটি কর্পোরেশন আয়োজিত এক নাগরিক সভায় তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করা হয়েছিল যে, সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া এই টার্মিনালটি এই স্থানে হলে পুরো জেলা ‘কলাপস’ বা অচল হয়ে যাবে। ঐ সভায় নগরবাসীর দেয়া মতামত এবং সিটি কর্পোরেশনের ভাবনা নিয়ে এক লিখিত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছিলো মন্ত্রণালয়ে।

ওয়ার্কিং ফর বেটার নারায়ণগঞ্জের আহ্বায়ক, ও সাবেক কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ প্রকল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব স্বীকার করে এক ভিন্নধর্মী প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “এই কন্টেইনার-বাল্ক টার্মিনালটি আমাদের নারায়ণগঞ্জের জন্য একটি উপকারী প্রকল্প। এর মাধ্যমে আমরা অর্থনৈতিকভাবে চাঙ্গা হবো। যেহেতু নারায়ণগঞ্জে গার্মেন্টস ভিত্তিক ব্যবসা, তাই এটা আমাদের জন্য দরকারই। কিন্তু এর স্থানটা নিয়ে আমার আপত্তি আছে। বর্তমান নির্ধারিত স্থানটি একেবারে শহরের ‘নাভির মধ্যে’ (হৃদপিণ্ড) হয়ে যায়। এমনিতেই যানজটের কারণে আমরা নারায়ণগঞ্জ শহরে চলতে পারি না, যখন এই বড় বড় কন্টেইনার চলাচল করবে, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে।”

তিনি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়ে বলেন, “এই স্থান থেকে সরিয়ে এটি যদি ২নং ঢাকেশ্বরী বা আশেপাশে নদীর পাশে নির্মাণ করা হয়, তবে নাগিনা জোহা সড়ক দিয়ে সহজেই চিটাগাং রোড হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মালামাল পৌঁছানো যাবে। দ্বিতীয়ত, কাঁচপুর ব্রিজের আশেপাশে বিআইডব্লিউটিএ-এর অনেক জায়গা আছে, সেখানে করলেও দেশজুড়ে পণ্য পরিবহনে সুবিধা হবে। শহর এখন হকার আর অবৈধ দখলদারদের দখলে, তার ওপর এই লরির জট নগরবাসীর উপর অনেকটা মরার উপর খাড়ার ঘা। আমরা এই প্রকল্প বাস্তবায়ন চাই। তবে, তা হোক শহরের বাইরে।

এদিকে, নারায়ণগঞ্জবাসী বলছে, আমরা উন্নয়নের বিরোধী নয়। ১৮৫ কোটি টাকার প্রকল্প অবশ্যই অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে, তবে তা হতে হবে ‘সঠিক স্থানে’। যে শহর এখনই অবৈধ স্ট্যান্ড আর হকার সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে নতুন করে কন্টেইনার টার্মিনাল করা মানে ১০ লাখ নগরবাসীকে স্থায়ীভাবে জিম্মি করা। জনবসতিপূর্ণ খানপুরকে লরি আর ধুলোবালির করিডোর বানিয়ে পুরো শহরকে বসবাসের অযোগ্য করা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
নগরবাসী আশা করছেন, জনস্বার্থ রক্ষায় সিটি কর্পোরেশন শক্ত অবস্থান নেবে এবং মন্ত্রণালয়কে বাধ্য করবে প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন করতে। অন্যথায়, প্রাচ্যের ড্যান্ডি অচিরেই একটি পরিত্যক্ত ‘মৃত নগরীতে’ পরিণত হবে বলে মনে করেন তারা।