মাকসুদেই নতুন স্বপ্ন দেখছে শহর-বন্দরবাসী

ওসমান পরিবারের দুর্গ কাঁপানো

30

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনের নির্বাচনী সমীকরণ এখন তুঙ্গে। দীর্ঘদিনের চেনা রাজনৈতিক ছক পাল্টে দিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন অদম্য সাহসী মাকসুদ হোসেন। নির্বাচন কমিশনে আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার পর এই আসনে বইছে নতুন রাজনৈতিক হাওয়া। সাধারণ ভোটারদের মতে, মাকসুদ হোসেন কেবল একজন প্রার্থী নন; তিনি এক লড়াকু যোদ্ধার নাম, যিনি গত মে মাসে প্রমাণ করেছেন যে ‘জনগণ সাথে থাকলে কোনো রক্তচক্ষু বা হুমকিতেই কাজ হয় না।’

জানা গেছে, ২০২৪ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত বন্দর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের সেই নাটকীয় লড়াই এখনো নারায়ণগঞ্জবাসীর স্মৃতিতে অমলিন। তৎকালীন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা একেএম সেলিম ওসমান প্রকাশ্য জনসভায় মাকসুদ হোসেনকে ‘রাজাকার পুত্র’ বলে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছিলেন। তাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে সেলিম ওসমান বলেছিলেন, “কীভাবে মুগুর মারতে হয় তা আমার জানা আছে।”

কিন্তু সেই কড়া হুমকির মুখেও মাকসুদ হোসেন দমে যাননি। তৎকালীন এমপির সরাসরি চ্যালেঞ্জকে ‘ড্যামকেয়ার’ বলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে তিনি মুছাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ভোটের লড়াইয়ে নামেন। ফলাফল ছিল অভাবনীয়। সংসদ সদস্যের মনোনীত প্রার্থী ও প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা এমএ রশিদকে প্রায় দ্বিগুণ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে মাকসুদ হোসেন বন্দর উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। মাকসুদ পেয়েছিলেন ২৯ হাজার ৮৭৩ ভোট, আর এমপির পছন্দের প্রার্থীর থলিতে জমা পড়েছিল মাত্র ১৪ হাজার ৮৩৮ ভোট। এই জয় তাকে রাতারাতি ‘জায়ান্ট কিলার’ হিসেবে পরিচিতি দেয় এবং ওসমান পরিবারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়।

মাকসুদ হোসেনের ফেরার খবরে বন্দর ও সদরের সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। বন্দরের কলাগাছিয়া এলাকার বাসিন্দা সানোয়ার হোসেন বলেন, “আমরা দেখেছি কীভাবে মাকসুদ হোসেন একাই পুরো প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হয়েছিলেন। তাকে রাজাকার পুত্র বলা হয়েছে, মুগুর মারার হুমকি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তিনি দমে যাননি। আমরা সাধারণ মানুষ তার সেই সাহসিকতার ভক্ত। এবারও লড়াইটা তেমন। বন্দর-সদরের দুঃখ ঘুচাতে মাকসুদ হোসেনের মতো একজন লড়াকু প্রতিনিধিই দরকার।”

শহরের এক ব্যবসায়ী জানান, “নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে যখন কেউ কথা বলতে সাহস পায়নি, তখন সেলিনা হায়াৎ আইভীর মতোই মাকসুদ হোসেনও মাঠ ছাড়েননি। তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বড় দল বা বড় নেতার সমর্থন নয়, জনগণের ভালোবাসাই শেষ কথা।”

এদিকে, এই আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালামের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে আবুল কালাম যতবারই এমপি নির্বাচিত হয়েছেন, ততবারই দেশের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জে বিএনপির বিশাল গণজোয়ার ছিল। দলীয় প্রতীকের সেই হাওয়ায় ভেসে উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়নমূলক কাজ না করেই তিনি বারবার বৈতরণী পার হয়েছেন। তার রাজনীতির মূল পুঁজি ছিল দুটি— ‘আমি চাঁদাবাজি করি না (ক্লিন ম্যান)’ এবং ‘আমি জনপ্রিয়’।

কিন্তু চব্বিশের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী ‘নতুন বাংলাদেশে’ সেই পুরনো পরিস্থিতি আর নেই। বিএনপি এখন বড় দল হিসেবে লাইমলাইটে থাকলেও, অতীতে আবুল কালামের পক্ষে যে অন্ধ গণজোয়ার কাজ করত, এবার তা আর লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে তার ‘ক্লিন ইমেজের’ ধুয়া এখন অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে।

আবুল কালাম যে ‘ক্লিন ইমেজের’ যুক্তি দিয়ে এতদিন পার পেয়ে আসছিলেন, এবার সেই ইমেজকে চ্যালেঞ্জ জানাতে মাঠে আছেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এবিএম সিরাজুল মামুন। ‘মামুন স্যার’ হিসেবে পরিচিত এই শিক্ষকের পারিবারিক ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত স্বচ্ছতা আবুল কালামের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী বলে মনে করছেন ভোটাররা। সচেতন মহলের মতে, কেবল ‘চাঁদাবাজি করি না’ বলাটাই যোগ্যতার মাপকাঠি হতে পারে না; নৈতিকতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতায় মামুন স্যার এখন অনেক এগিয়ে।

অন্যদিকে, কালাম অনুসারীদের ‘জনপ্রিয়তার’ দাবিকে বড় ধরনের টেক্কা দিচ্ছেন মাকসুদ হোসেন। আবুল কালাম যেখানে দলীয় জোয়ারের অপেক্ষায় থাকেন, সেখানে মাকসুদ হোসেন প্রমাণ করেছেন তিনি একাই একটি শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারেন। ওসমান পরিবারের সর্বাত্মক বিরোধিতা সত্ত্বেও একক দক্ষতায় জয়ী হওয়া মাকসুদ এখন কালামের জনপ্রিয়তার প্রধান চ্যালেঞ্জ।

প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে আত্মবিশ্বাসী মাকসুদ হোসেন বলেন, “আমার প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়টি ছিল একটি গেইম বা সাজানো নাটক। তারা ভেবেছিল আমাকে মাঠ থেকে সরিয়ে দিলে পথ পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহর রহমতে সত্যের জয় হয়েছে। আমি আগেও প্রমাণ করেছি যে সাধারণ মানুষই ক্ষমতার মূল উৎস। জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থনে ইনশাআল্লাহ এবারও বড় চমক আসবে।”

প্রতিপক্ষ শিবিরে এখন নীরব অস্বস্তি। বন্দরের সাধারণ মানুষের স্লোগান এখন একটাই— “যার সাথে আছে জনগণ, তার কীসের দলীয় সমর্থন?” রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে এবার লড়াই হবে ত্রিমুখী। তবে বন্দর এলাকায় মাকসুদ হোসেনের যে বিশাল জনসমর্থন এবং আগের ‘জায়ান্ট কিলিং’ পারফরম্যান্স রয়েছে, তাতে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়বেনÑএমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।