
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গতকাল মঙ্গলবার (১৯ আগস্ট) দুপুরে হুমায়ুন-আনোয়ার প্যানেলের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। প্রচারণায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, দলের নাম ভাঙিয়ে কয়েকজন শিল্পপতি সেলিম ওসমানের প্রেসক্রিপশনে কাজ করছে এবং বিএনপিতে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় আইনজীবী সমিতিতেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
তবে তার এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়েছেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী অ্যাডভোকেট এস এম গালিব।
তিনি সাখাওয়াত হোসেন খানের বিরুদ্ধেই ওসমান পরিবারের সাথে আঁতাত এবং মেয়র নির্বাচনে ২ কোটি টাকা গ্রহণের পুরোনো সেই অভিযোগ তুলেছেন।
মঙ্গলবার দুপুরে নির্বাচনী প্রচারণায় অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, “সেলিম ওসমানের প্রেসক্রিপশনে কিছু শিল্পপতি যারা বিএনপির নমিনেশন পাওয়ার জন্য নেমেছে, আজকে তারা এই আইনজীবী সমিতিতেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। তারা বিএনপির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, সেলিম ওসমানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।”
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আমাদের কাছে খবর আছে, আপনি কোন কোন আইনজীবীর কাছে টেলিফোন করে বিদ্রোহীদের জন্য ভোট চেয়েছেন, সেটা আমাদের কাছে প্রমাণ আছে। আমরা প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে এবং তারেক রহমানকে জানাবো।”
বহিরাগত শিল্পপতিদের মেনে নেওয়া হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মাঠে যারা ১৫ বছর ছিলাম, আমাদের মধ্য থেকে যাকে নমিনেশন দেবে আমরা তাকে মেনে নেবো। কিন্তু কোনো বহিরাগত, কোনো শিল্পপতিকে আমরা মেনে নেবো না। সেই শিল্পপতিরা আজকে আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে এবং বিএনপির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়। এর দাঁতভাঙ্গা জবাব দেওয়া হবে।”
তিনি হুমায়ুন-আনোয়ার প্যানেলকে বিএনপি, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সম্মানের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন। সকল আইনজীবীকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই প্যানেলের ১৭জনের সকলকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
সাখাওয়াত হোসেন খানের বক্তব্যের পরপরই গণমাধ্যমের কাছে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান আইনজীবী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী অ্যাডভোকেট এস এম গালিব। তিনি সাখাওয়াতের বক্তব্যকে “ভূতের মুখে রাম নাম” বলে আখ্যা দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তুলে বলেন, “সাখাওয়াত ভাই কিভাবে এই কথা বলেন? তার স্ত্রী শামীমা আপা নিজেই তো ছিলেন সেলিম ওসমানের এপিএস। উনি নিজেই তো সেলিম ওসমানের সাথে আঁতাত করে রাজনীতি করছেন।”
গালিব আরও বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে বলেন, “২০১৬ সালে তিনি (সাখাওয়াত) যখন মেয়র নির্বাচন করেন, তখন শামীম ওসমানের কাছ থেকে ২ কোটি টাকা নিয়েছিলেন আইভীকে পরাজিত করানোর জন্য। এটা নারায়ণগঞ্জের মানুষ সবাই জানে। এই টাকা নিয়ে তৎকালীন সময়ে টিপু ভাইয়ের সাথে তার চরম ঝগড়া হয়েছে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমেও সেই খবর প্রকাশিত হয়েছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও গভর্নমেন্ট প্লিডার (জিপি) নিয়োগের সময়ও বড় ধরনের বাণিজ্য হয়েছে। সিনিয়র-জুনিয়র নিয়ম মেনে নিয়োগ হয় নি, যে বেশী অর্থ দিয়েছে তাকে বড় পদে আসীন করা হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার উদাহরণ দিতে পারবেন কিনা জানতে চাইলে গালিব বলে, যারা টাকা দিয়ে পিপি, জিপি হয়েছে তারা কি আর বলবে।
রাজনৈতিকভাবে সাখাওয়াত এখন কোণঠাসা দাবি করে গালিব বলেন, “মডেল মাসুদের রাজনীতির কাছে তিনি ধরাশায়ী হয়ে গেছেন। তিনি মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক, কিন্তু তার সমস্ত লোক মডেল মাসুদের কাছে চলে গেছে। চাঁদাবাজি করার কারণেই মূলত তিনি আজ অসহায়।
এদিকে, অ্যাডভোকেট গালিবের তোলা সকল অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি বলেন, “আমার স্ত্রী ৩০ বছর ধরে আইন পেশায় নিয়োজিত, তার অন্য কোনো পেশায় থাকার সুযোগই নেই।”
পিপি ও জিপি নিয়োগে বাণিজ্যের অভিযোগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলে তা বলতে হবে।” নিজের জনপ্রিয়তার প্রশ্নের তিনি বলেন, “আমাদের রাজনৈতিক অনুষ্ঠানগুলোতে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতিই প্রমাণ করে আমাদের জনপ্রিয়তা কোথায়।”
গালিবের অভিযোগের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে সাখাওয়াত বলেন, “যেহেতু তারা (রেজা-গালিব) বিএনপির প্যানেলের বিরোধিতা করে নির্বাচন করছে, আর আমরা দলের স্বার্থে হুমায়ুন-আনোয়ার প্যানেলের পক্ষে কাজ করছি। তাই এটা সহ্য করতে না পেরেই সে এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে।”
এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও কাদা ছোড়াছুড়ি প্রকাশ্যে চলে এসেছে। যা দলের তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি ও হতাশা তৈরি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই বিভেদ আসন্ন নির্বাচনে দলীয় প্যানেলের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের সময়সহ আরও বেশ কয়েকবার এডভোকেট সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন এডভোকেট এস এম গালিব।







