রক্তাক্ত জখম, মাথায় সেলাই, তবুও পুলিশ বলছে ‘ধর্তব্য অপরাধ নয়’: বিচারপ্রার্থীকে হয়রানির অভিযোগ

ওসি ও তদন্তকারী কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন, মামলা গ্রহণে ফতুল্লা পুলিশের ধারাবাহিক অনীহা

29
মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা মোঃ সাজু পাঠান তার জখম দেখাচ্ছেন, পাশে ফতুল্লা মডেল থানা।
ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা নিতে অনীহার অভিযোগ তুলেছেন মোঃ সাজু পাঠান, যার মাথায় গুরুতর জখম হয়েছে।

তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মারামারিতে এক ব্যক্তির মাথায় দুটি সেলাই লাগার মতো গুরুতর জখম হলেও ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং তদন্তকারী কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং ‘ছোটখাটো ঘটনা’ বলে অভিহিত করে মামলা না নেওয়ার ঘটনায় ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন। পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণে এমন ধারাবাহিক অনীহা ও জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারী সাজু পাঠান পুলিশের এমন আচরণে চরম হতাশ।

ঘটনার বিবরণ:
গত বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) দুপুরে ফতুল্লার লালপুর চৌধুরীপাড়া এলাকার বাসিন্দা মোঃ সাজু পাঠান (২৭) এবং তার স্ত্রী মিষ্টি (২০) প্রতিবেশীদের দ্বারা হামলার শিকার হন। অভিযোগ অনুযায়ী, কারেন্ট ব্যবহার করে রাইস কুকারে ভাত রান্না করা নিয়ে বিবাদি শান্তি বেগম (৫৫) এবং সালেহা বেগম ( ৩৫) সহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জন সাজু পাঠানের ওপর হামলা চালায়। সাজু পাঠানের অভিযোগ, তাকে কিল, ঘুষি, লাথি মারা হয় এবং কাঠের ডাসা দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়, যার ফলে তার মাথায় গুরুতর রক্তাক্ত জখম হয় এবং সেলাই দিতে হয়েছে। তার স্ত্রী মিষ্টি ও ছেলে নূর আলমকেও মারধর করা হয়। হামলার পর নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট খানপুর হাসপাতালে তিনি চিকিৎসা গ্রহণ করেন।

পুলিশের গড়িমসি ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য:
ভুক্তভোগী সাজু পাঠান ফতুল্লা মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেও পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করছে বলে জানান।

কেন মামলা নেওয়া হচ্ছে না – জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সঞ্জিব জোয়াদ্দার বলেন, “মামলা নেওয়ার দায়িত্ব আমার নয়, ওসি সাহেবের। আমি তাকে (ওসি) রক্তাক্ত অবস্থার ভিডিও, ছবি সবই দেখিয়েছি। কিন্তু তিনি বলেছেন এটা ধর্তব্য অপরাধ না, ৩২৩ ধারার অপরাধ, তাই মামলা নেওয়ার দরকার নেই।”

তবে, ওসি আনোয়ার হোসেনের বক্তব্য এসআই সঞ্জিব জোয়াদ্দারের বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, “তার সেলাই লেগেছে এমন কথা আমার জানা নেই, আপনার তথ্যে ভুল আছে। সামান্য একটু কেটে গেছে, এটা ধর্তব্য অপরাধ নয়। তাই মামলা নেওয়া হয়নি।”

যখন তাকে জানানো হয় যে, অভিযোগপত্রেই সেলাইয়ের কথা উল্লেখ আছে, তখন তিনি তার আগের অবস্থান থেকে সরে এসে বলেন, “আমাকে সেলাইয়ের কথা কেউ বলেনি, আমাকে বলছে মাথায় একটু আঘাত।”

মামলা নিতে কোনো বাধা আছে কিনা জানতে চাইলে ওসি আনোয়ার হোসেন বলেন, “এমন মামলা নিলে তো প্রতিদিন ৩০টিরও অধিক মামলা নিতে হবে।” ৩০টিরও অধিক মামলা নিতে তার কোনো সমস্যা বা বাধা-নিষেধ আছে কিনা – এমন পাল্টা প্রশ্নে তিনি বলেন, “না বাধা নেই। তবে, এ ধরনের ছোটখাটো ঘটনায় মামলা নেওয়া হয় না। আর মামলা নিলেও তার মেডিকেল রিপোর্টে নরমালই আসবে।”

এই বক্তব্যে আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে এমন কথা জানানো হলে তিনি বলেন, “অধর্তব্য নিয়ে তো মামলা হয় না, এখন প্যাঁচাইলে তো আর কিছু করার নাই।”

আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত:
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাথায় সেলাই লাগার মতো আঘাত কোনোভাবেই ‘সামান্য আঘাত’ বা ‘অধর্তব্য অপরাধ’ নয়। দণ্ডবিধির ৩২৫ বা ৩২৬ ধারা অনুযায়ী এটি গুরুতর আঘাতের অপরাধ এবং এটি একটি আমলযোগ্য অপরাধ, যার জন্য পুলিশ মামলা নিতে বাধ্য। পুলিশের এমন আচরণ ফৌজদারি কার্যবিধি এবং দণ্ডবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনোয়ার প্রধান বলেন, “এ ধরনের ঘটনায় মামলা নেওয়া যাবে না এমন কথা পুলিশ বলতে পারে না। তবে, ভুক্তভোগী চাইলে আদালতে মামলা দায়ের করতে পারে।”

ভুক্তভোগীর হতাশা:
এ ঘটনায় গভীর হতাশা প্রকাশ করে মোঃ সাজু পাঠান বলেন, “১০-১২ জন মিলে আমার মাথা ফাটিয়ে দিয়ে আমাকে ও আমার স্ত্রীকে বেদম মারধর করে। আমার মাথায় সেলাই লাগার পরও থানা পুলিশ মামলা নিতে চাচ্ছে না। আমি ন্যায়বিচারের আশায় পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু পুলিশ যেভাবে একে ‘ছোট ঘটনা’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছে, তাতে আমরা চরম হতাশ।” তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমার মাথায় সেলাই পড়েছে, এটা কি সামান্য আঘাত? আমরা এর বিচার চাই। তিনি কোনো প্রকার অর্থ লেনদেন না করায় হয়তো তার মামলা গ্রহণ করা হচ্ছে না।”

ফতুল্লা পুলিশের ধারাবাহিক অভিযোগ:
ফতুল্লা পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণে গড়িমসির অভিযোগ নতুন নয়। গত ২৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ আদালত প্রাঙ্গণে মামলার বাদীর পরিবারের ওপর হামলার ৪৮ ঘণ্টা পরও ফতুল্লা থানা পুলিশ মামলা নিতে রাজি হচ্ছিল না। গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রচার হলে মিডিয়ার চাপে অবশেষে তিন দিন পর ফতুল্লা পুলিশ সেই মামলাটি নিতে বাধ্য হয়।

উদ্বেগ ও দাবি:
এ দুটি ঘটনা ফতুল্লা থানা পুলিশের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সাধারণ মানুষের গুরুতর আঘাতকে ‘ছোট ঘটনা’ বলা এবং মামলা গ্রহণে গড়িমসি করা পুলিশের দায়িত্বশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পুলিশের এই ধারাবাহিক আচরণ আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি করে। পুলিশের প্রতি জন আস্থা ফিরিয়ে আনতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।