
ক্রমশই জটিল হয়ে উঠছে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশ। গতকাল (০৩ নভেম্বর) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দেশের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৩৭ আসনে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ঘোষণায় নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনের মধ্যে ৪টিতে প্রার্থীর নাম প্রকাশ পেলেও একমাত্র নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি ফাঁকা রাখা হয়।
এই সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন শুরু হয়—২০১৮ সালের মতো এবারও জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের জেলা আমির মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী এই আসনে মনোনয়ন পেতে পারেন।
বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন—সাবেক এমপি ও এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী, ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি শাহ আলম, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজিব এবং জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি।
এদিকে, গত ১ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জে জমিয়তের এক অনুষ্ঠানে যোগ দেন বিএনপির মুখপাত্র সালাহউদ্দিন আহমেদ। রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, কাসেমীর মনোনয়ন নিয়ে এ ঘটনাটি একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।
এদিকে, ৩ নভেম্বর প্রার্থীদের তালিকায় নারায়ণগঞ্জ-৪ ফাঁকা রাখায় কাসেমী অনুসারীদের মধ্যে আনন্দের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। তারা মনে করছেন, বিএনপি জোটের শরিকের জন্যই আসনটি ছেড়ে দিয়েছে।
তবে, মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) সরকার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে নতুন বিধান জারি করেছে—জোটের শরিক হলেও নির্বাচনে অংশ নিতে হবে নিজ দলের প্রতীকে। এতে করে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে কাসেমীর সামনে।অর্থাৎ, বিএনপি ছাড় দিলেও কাসেমীকে নিজ দলের খেজুর গাছ প্রতীকে লড়তে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “ধানের শীষের পরিবর্তে খেজুর গাছ নিয়ে জেতা সহজ হবে না।”
এদিকে, বিএনপির এই সিদ্ধান্তে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের নীরব ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের অনেকে মনে করছেন, দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে যারা মাঠে থেকে দলের পক্ষে কাজ করছেন, তাদের উপেক্ষা করে জোটের শরিকের জন্য আসন ছেড়ে দেওয়া অন্যায্য।
কেউ কেউ বলছেন, “যারা ঝুঁকি নিয়ে বিএনপির পতাকা ধরে রেখেছে, তারা যদি আবারও প্রার্থী বঞ্চিত হয়, তাহলে তৃণমূলের মনোবল ভেঙে যাবে।” এই ক্ষোভ প্রকাশ্যে না এলেও দলীয় আলোচনায় এখন সেটাই মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
ফতুল্লার স্থানীয় বিএনপি নেতা আবদুল কাদের বলেন, “আমরা মাঠে কাজ করি ধানের শীষের পক্ষে। মানুষ এখনো বিএনপি প্রতীকের দিকে তাকিয়ে থাকে। কাসেমী মনোনয়ন পেলেও প্রতীক না থাকলে ভোট ধরে রাখা মুশকিল হবে।”
ফতুল্লার তরুণ কর্মী রায়হান হোসেন বলেন, “শাহ আলম ভাই, রাজিব ভাই ও রনি ভাইদের আমরা জানি দলের প্রতি অনুগত। তারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাবেন না। তবে জনপ্রিয়তার দিক থেকে মোহাম্মদ আলী স্যার সব দিক থেকে এগিয়ে আছেন।”
আরেক স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহিন আহমেদ বলেন, “মোহাম্মদ আলী স্যার শুধু রাজনীতিবিদ নন, সমাজসেবকও। এফবিসিসিআই’র সভাপতি হিসেবে দেশজুড়ে তার পরিচিতি আছে। তিনি প্রার্থী হলে ফল অন্যরকম হতে পারে।”
সূত্র জানায়, সম্ভাব্য জটিলতা বুঝে আগেই ভেতরে ভেতরে নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছেন মোহাম্মদ আলী। ফতুল্লা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ইতিমধ্যেই কয়েকটি গোপন বৈঠকও করেছেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “যদি তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও মাঠে নামেন, তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের কারণে ফলাফল উলটপালট হতে পারে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, “ফতুল্লাসহ পুরো জেলায় মোহাম্মদ আলীর জনপ্রিয়তা এখনও অটুট। উন্নয়ন, ব্যবসায়িক নেতৃত্ব ও সংগঠন পরিচালনায় তিনি অভিজ্ঞ। অন্যদিকে কাসেমী ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কারণে কিছু ভোট পেলেও সাধারণ ভোটারদের টানতে পারবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে।”
সব মিলিয়ে, বিএনপি-জমিয়ত জোটের এই জটিল সমীকরণে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন হয়ে উঠেছে সবার নজরের কেন্দ্রবিন্দু। আগামী দিনগুলোতে দলের সিদ্ধান্ত ও প্রার্থীদের অবস্থানই নির্ধারণ করবে—এ আসনে শেষ হাসি কে হাসবে।
[email protected]







