
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনে শিল্পপতি মাসুদুজ্জামানের আকস্মিক মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে একধরনের হতাশা, ক্ষোভ ও দীর্ঘশ্বাস। দলের অনেকেই বলছেন, এই মনোনয়ন “ত্যাগী ও নির্যাতিত কর্মীদের আত্মত্যাগের প্রতি উপহাস”, আর “বিএনপির আদর্শিক রাজনীতিতে টাকার প্রভাবের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ”।
এরই মধ্যে মাদারীপুর-১ আসনে ঘোষিত প্রার্থীর নাম স্থগিত করেছে বিএনপি। দলীয় সূত্রের ভাষায়, ঘোষিত প্রার্থীরা এখনো “প্রাথমিক” পর্যায়ে আছেন, সংযোজন-বিয়োজন হতে পারে। এই ঘোষণায় নারায়ণগঞ্জের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মনে নতুন করে আশা ও অনিশ্চয়তার দোলাচল তৈরি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাসুদুজ্জামানকে নিয়ে দেখা দিয়েছে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। দলীয় কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটাররা অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, “কেন্দ্র কি তবে টাকার কাছে হেরে গেলো? ত্যাগী নেতাদের বছরের পর বছর নির্যাতন, জেল-জুলুম আর দুঃসহ স্মৃতি কি মূল্যহীন হয়ে গেলো?”
আবেগঘন সুরে এক বিএনপি কর্মী বলেন, “আমরা যখন লাঠিপেটা খাচ্ছিলাম, তখন তিনি কোথায় ছিলেন? আজ দল যখন ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখছে, তখন তিনি ধানের শীষের মালিক হয়ে গেলেন! এটা আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে।”
আরেকজন তরুণ নেতা মন্তব্য করেছেন, “এমন মনোনয়ন মানে ত্যাগের রাজনীতি নয়, টাকার রাজনীতি। এরাই মাঠের কর্মীদের মনোবল ভেঙে দেয়।”
সাধারণ ভোটাররাও বিষয়টি ভালো চোখে দেখছেন না। তাদের মতে, “অতীতে আওয়ামী লীগও এই আসনে একজন ব্যবসায়ীকে মনোনয়ন দিয়েছিল। এমপি হওয়ার পর জনগণ তার দেখা পায়নি; নিজের ব্যবসা ও স্বার্থেই ব্যস্ত ছিলেন তিনি। বিএনপিও এখন সেই একই ভুল করছে।”
একজন স্থানীয় নাগরিক বলেন, “এখন মানুষের সঙ্গে করমর্দন, দরজায় দরজায় যাওয়াÑসবই ভোটের কৌশল। কিন্তু একবার এমপি হলে তিনি আর নাগালের বাইরে চলে যাবেন। সেলিম ওসমানের মতো তিনিও নিজের স্বার্থেই ব্যস্ত হয়ে পড়বেন।”
আরেকজন ব্যবসায়ী ভোটার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা এমন কাউকে চাই না যিনি ক্ষমতা পেলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যাবেন। আমরা এমন প্রতিনিধি চাই, যিনি জনগণের দুঃখে পাশে থাকবেন।”
মাসুদুজ্জামানের সঙ্গে ওসমান পরিবার, আইভী ও আওয়ামীলীগের নেতাদেও সাথে সখ্যতার অসংখ্য ছবি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। ছবিগুলোর নিচে কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে লিখছেন- “ধানের শীষের প্রচারণায় সেলিম ওসমানসহ ওসমান পরিবারের সক্রিয় অংশগ্রহণ!”
যদিও ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ওসমান পরিবার আত্মগোপনে রয়েছে বলে জানা গেছে, তবুও এসব ছবি তৃণমূলের ক্ষোভে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, “যে প্রার্থী ওসমান পরিবার, আইভী ও আওয়ামীলীগের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠ, তিনি কিভাবে সরকারের বিরোধী দলের প্রতীক নিয়ে মাঠে নামবেন?”
শুধু তাই নয়, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর সঙ্গেও মাসুদুজ্জামানের সুসম্পর্ক নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি হিসেবে তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, “সাবেক মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে মামলা সাপোর্ট করি না। উনি সারাজীবন একাই যুদ্ধ করেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ঠিক নয়।”
বিএনপির কর্মীদের মতে, “যিনি আওয়ামী লীগের নেতার পক্ষে অবস্থান নেন, তিনি কীভাবে বিএনপির প্রার্থী হন?”
একাধিক তৃণমূল নেতা ব্যঙ্গ করে বলেছেন, “ব্যবসায়ী তো, তাই দুই দিকেই ইনভেস্ট করে রাখেন! আজ বিএনপিকে সাহায্যের গল্প বলছেন, কাল আবার বলবেনÑআইভী ও ওসমান পরিবারকে পকেট ভরে দিয়েছি।”
তাদের দাবি, আইভীকে বিগত নির্বাচনে তাঁর আর্থিক সহযোগিতা ‘ওপেন সিক্রেট’ বিষয়। এই পটভূমিতে তাঁর প্রার্থিতা বিএনপির তৃণমূলের কাছে “আদর্শবিরোধী” ও “আস্থাহীনতার প্রতীক” হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, ঘোষিত নামগুলো “প্রাথমিক পর্যায়ে” আছে, চূড়ান্ত নয়। মাদারীপুর-১ আসনের মনোনয়ন স্থগিতের ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের নেতাকর্মীরাও এখন এক ধরনের আশা-শঙ্কার দোলাচলে রয়েছেন।
একদিকে ক্ষোভ ও হতাশা, অন্যদিকে মনোনয়ন পরিবর্তনের ক্ষীণ আশাÑসব মিলিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে স্থানীয় সংগঠন। এর ফলে নির্বাচনী মাঠে প্রস্তুতিও ব্যাহত হচ্ছে।
একজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যিনি আইভী ও ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ, তিনি যদি বিএনপির প্রতীক পান, তাহলে তৃণমূলের অর্ধেকই নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে।”
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটাই, বিএনপি কি জনগণের প্রতিনিধি খুঁজছে, নাকি প্রভাবশালী ব্যবসায়ীকে?
একজন প্রবীণ নেতা বলেন, “দলের পতাকা থাকবে, কিন্তু মাঠে মানুষ থাকবে না। এই মনোনয়ন বিএনপির আন্দোলনের প্রাণশক্তিকে দুর্বল করছে।”
আরেকজন কর্মীর ভাষায়, “ত্যাগ, নির্যাতন, সংগ্রামের রাজনীতির জায়গা যদি টাকায় বিক্রি হয় তাহলে বিএনপি নয়, সেটি কেবল ব্যবসায়ীদের ক্লাব হয়ে যাবে।”







