
নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পর চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতিতে পটুয়াখালীর পায়রাগঞ্জ এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক এবং মীম-শরৎ গ্রুপ ও শাহজালাল নেভিগেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলহাজ্ব মোহাম্মদ সোহাগকে। সোমবার (২ জুন) দুপুরে তাঁরই ব্যবহৃত গাড়ির ভেতর থেকে হাত-পা ও চোখ বাঁধা এবং আহত অবস্থায় স্থানীয় জনতা তাঁকে উদ্ধার করে। পরবর্তীতে পুলিশ তাঁকে হেফাজতে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে। এই অপহরণের ঘটনায় প্রাথমিক সন্দেহ তাঁরই গাড়ির সাবেক ড্রাইভার কবিরের দিকে গেলেও, কারা এবং কেন তাঁকে এত দূরে নিয়ে এভাবে ফেলে গেল, সেই রহস্য উন্মোচনে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
তথ্য সূত্রে জানা গেছে, আলহাজ্ব মোহাম্মদ সোহাগ রোববার (১ জুন) রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের গলাচিপা এলাকার আল্লামা ইকবাল রোড (কলেজ রোড) থেকে নিজ ব্যবহৃত গাড়িসহ অপহৃত হন। এর আগে, কিছু সূত্রে জানা গিয়েছিল, তিনি শনিবার রাতে নিতাইগঞ্জের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘গাউসিয়া এন্টারপ্রাইজ’ থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে নিখোঁজ হন। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর সন্ধান না পাওয়ায় নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় বিষয়টি জানান। একই সময় থেকে ব্যবসায়ী সোহাগের গাড়ির ড্রাইভার কবিরও নিখোঁজ ছিলেন, যা পরিবারের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তোলে।
তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে ড্রাইভার কবিরের কিছু সন্দেহজনক আচরণের তথ্য পায় পুলিশ ও পরিবার। জানা যায়, ব্যবসায়ী সোহাগ নিখোঁজ হওয়ার দিন অর্থ্যাৎ ঘটনার রাতে ড্রাইভার কবির সোহাগের আরেকটি গাড়ি বাড়ির গ্যারেজ থেকে বের করে নিয়ে যায়। দারোয়ান কারণ জানতে চাইলে কবির জানায়, “সাহেব (সোহাগ) আগের গাড়ি নিয়ে ঢাকা গেছেন, আমাকে এই গাড়ি নিয়ে তাকে আনতে বলেছেন।” এই ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা ড্রাইভার কবিরের স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রথমে তিনি নীরব থাকলেও, পরে জেরার মুখে জানান, তাঁর স্বামী (ড্রাইভার কবির) তাঁকে ফোন করে বাসা থেকে পালিয়ে যেতে বলেছিলেন, কারণ পুলিশ তাঁকে খুঁজতে আসতে পারে।
এই তথ্যের পর প্রশাসন আরও তৎপর হয়। মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং করে জানা যায়, ব্যবসায়ী সোহাগের ব্যবহৃত আইফোনটি অপহরণকারীরা নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার কোনো এক স্থানে ফেলে রেখে গেছে।
সব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে সোমবার (২ জুন) দুপুর ১২টার দিকে পটুয়াখালীর পায়রাগঞ্জ এলাকায় স্থানীয়দের সহায়তায় আলহাজ্ব মোহাম্মদ সোহাগকে তাঁর নিজস্ব গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়রা জানান, ভোর ৬টার দিকে তারা দুটি গাড়ি (একটি প্রাডো ও একটি প্রাইভেটকার) সন্দেহজনকভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। এর মধ্যে একটি গাড়ির ভেতর থেকে একজন মানুষ সাহায্যের জন্য হাত নাড়ছিলেন। কাছে গিয়ে তারা দেখতে পান, হাত-পা, কোমর ও মুখ বাঁধা এবং আহত অবস্থায় একজন কাতরাচ্ছেন। তাৎক্ষণিকভাবে তারা তাঁকে উদ্ধার করে চোখের বাঁধন খুলে দেন।
উদ্ধার হওয়ার পরপরই স্থানীয়দের সহযোগিতায় আলহাজ্ব সোহাগ তাঁর স্ত্রীকে ফোন করে নিজের অবস্থা জানান। খবর পেয়ে পটুয়াখালী ডিবি পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে এবং বিষয়টি তাঁর পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় ব্যবসায়ী মো. সোহাগ জানান, “আমি কাজ শেষে বাসায় ফিরছিলাম। পথিমধ্যে ৫/৬ জন ব্যক্তি আমার গাড়ির গতি রোধ করে জোরপূর্বক অপহরণ করে। এসময় তারা আমার শরীরে ইলেকট্রিক শক দেয় এবং মাথায় পিস্তলের বাট দিয়ে আঘাত করে। আল্লাহর রহমতে এবং সকলের দোয়ায় আমি বেঁচে গেছি।”
একটি বিশ্বস্ত সূত্র দাবি করেছে, এই অপহরণের পেছনে ড্রাইভার কবিরের ব্যক্তিগত ক্ষোভ একটি কারণ হতে পারে। সম্প্রতি ব্যবসায়ী সোহাগের একটি গাড়ির অ্যাক্সিডেন্ট করে ড্রাইভার কবির, এতে গাড়িটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ ঘটনায় সোহাগ ক্ষুব্ধ হয়ে ড্রাইভার কবিরকে শাসন করেন এবং একটি থাপ্পড়ও দেন বলে জানা যায়। এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে ড্রাইভার কবির তাঁর সহযোগীদের নিয়ে এই কাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে, কে বা কারা সুনির্দিষ্টভাবে তাঁকে অপহরণ করেছে, কিংবা কেন তাঁকে এত দূরে পটুয়াখালীতে নির্যাতন করে ফেলে যাওয়া হলো, সে বিষয়ে পুলিশ এখনও কোনো স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেনি।
এই ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ ও পটুয়াখালীর ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার ও সদর থানা ওসিকে কল দিলেও তারা কল রিসিভ করেন নি।







