
যে মৃত্যু কাঁদিয়েছিল দেশ, অবশেষে বিচারের পথে প্রথম ধাপ
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জের নয়ামাটিতে ঘাতকের গুলিতে ছয় বছরের শিশু রিয়া গোপের মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো দেশকে কাঁদিয়েছিল। বাবার নিরাপদ আশ্রয় ভেবে কোলে তুলে নেওয়ার মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে যায়। সেই হৃদয়বিদারক ঘটনার প্রায় ১১ মাস পর অবশেষে বিচার পাওয়ার এক অনিশ্চিত লড়াই শুরু হয়েছে। যে পরিবার ভয় ও বিচারহীনতার আশঙ্কায় নীরব ছিল, তাদের হয়ে রাষ্ট্র নিজেই এগিয়ে এসেছে। মঙ্গলবার (১ জুলাই) রাতে পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়েরের মাধ্যমে এই বিচার প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো।
সেই অভিশপ্ত বিকেল: ছাদ থেকে বাবার কোলে নিথর রিয়া
ঘটনাটি ছিল গত বছরের ১৯ জুলাইয়ের। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে যখন নারায়ণগঞ্জের রাজপথে সহিংসতা আর গোলাগুলি চলছিল, তখন নয়ামাটি এলাকার নিজ বাড়ির ছাদে খেলায় মত্ত ছিল ছোট্ট রিয়া। আচমকা গোলাগুলির শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বাবা দীপক কুমার গোপ। মেয়ের সুরক্ষার কথা ভেবে তিনি দ্রুত ছুটে যান ছাদে তাকে নিরাপদে নিচে নামিয়ে আনার জন্য। কিন্তু ভাগ্য যেন সেদিন সহায় ছিল না। বাবাকে দেখে তার কোলে ওঠার মুহূর্তেই একটি গুলি এসে লাগে রিয়ার মাথায়। বাবার চোখের সামনেই রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর হয়ে লুটিয়ে পড়ে তার ছোট্ট মেয়ে। মেয়ের উষ্ণ রক্তে ভিজে যায় বাবার কোল, যা ছিল তার জীবনের এক দুঃসহ স্মৃতি।
হাসপাতালে পাঁচ দিনের লড়াইয়ের পর থেমে যায় স্পন্দন
গুলিতে আহত হওয়ার পর মুমূর্ষু অবস্থায় রিয়াকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ পাঁচ দিন ধরে সে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৪ জুলাই চিরতরে থেমে যায় ছয় বছরের রিয়ার জীবনের স্পন্দন। দীপক গোপ ও বিউটি ঘোষ দম্পতির একমাত্র সন্তান, তাদের একমাত্র প্রদীপ সেদিন নিভে গিয়েছিল চিরদিনের জন্য। এই মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো পরিবারকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।
ভয় আর হতাশা: বিচার চাওয়ার সাহস হারানো পরিবার
রিয়ার মৃত্যুর পর তার বাবার কাঁধে নিথর দেহের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল উঠলেও ভয়ে বা বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতায় রিয়ার পরিবার মামলা করার সাহস পায়নি। রিয়ার মা বিউটি ঘোষের কণ্ঠে তখন ঝরে পড়েছিল অসহায়ত্ব আর হতাশা। তিনি বলেছিলেন, “মামলা করে কী হবে? কাদের নামে করব? আমরা বিচার সৃষ্টিকর্তার ওপর ছেড়ে দিয়েছি।” একটি বাবার কাঁধে মেয়ের লাশের ভারের চেয়ে ভারী আর কিছু নেই, সেই ভার বয়ে বেড়ানো দীপক গোপের নীরব আর্তি হয়তো অনেকের কানে পৌঁছায়নি তখন।
রাষ্ট্রের পদক্ষেপ: ১১ মাস পর পুলিশের মামলা দায়ের
দীর্ঘ ১১ মাস পর রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা থেকে মামলা দায়েরের এই পদক্ষেপ নিয়েছে পুলিশ।
গতকাল মঙ্গলবার (১ জুলাই) রাতে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।
এই মামলায় তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের অজ্ঞাত ১৫০ থেকে ২০০ জন নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে।
যাদের বেপরোয়া গুলিবর্ষণের কারণেই একটি ফুলের মতো শিশু ঝরে গিয়েছিল বলে অভিযোগ।
এই মামলাটি দেরিতে হলেও একটি বার্তা দেয়—রাষ্ট্র তার নাগরিকের এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড ভুলে যায় না।
আশার আলো নাকি দীর্ঘ যাত্রার শুরু?
রিয়া গোপের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি ছিল দেশের বুকে একটি গভীর ক্ষত।
পুলিশের এই মামলা দায়েরের মধ্য দিয়ে রিয়ার নিথর হয়ে যাওয়ার সেই মর্মান্তিক দৃশ্যের বিচার পাওয়ার এক ক্ষীণ আশা তৈরি হলো।
এই মামলাটি কি দীপক গোপের জন্য সামান্যতম সান্ত্বনা হবে, নাকি বিচারহীনতার দীর্ঘ এক যাত্রার শুরু—সেই উত্তর কেবল সময়ই দেবে।
তবে যে মৃত্যু দেশকে কাঁদিয়েছিল, সেই মৃত্যুর বিচার দেখার অপেক্ষায় এখন তাকিয়ে আছে দেশবাসী।
পুলিশের এই পদক্ষেপ সেই ক্ষত পূরণে ন্যায়বিচারের প্রথম ধাপ হবে কি না, সেই আশাতেই এখন সবাই।







