
জাতীয় নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিটি কর্মসূচিকে নিছক প্রতিবাদ বা সমাবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরোদস্তুর নির্বাচনী প্রচারণার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে অনুষ্ঠিত হওয়া বিভিন্ন দলের কর্মসূচিগুলো ছিল তারই স্পষ্ট উদাহরণ। প্রতিটি দলই নিজ নিজ প্ল্যাটফর্ম থেকে তাদের ভবিষ্যৎ রূপকল্প, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং প্রধান বার্তাগুলো জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
এনসিপির লক্ষ্য ‘মাফিয়াতন্ত্র’ মুক্ত নতুন রাজনীতি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্ব দ্বারা গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজেদেরকে প্রচলিত রাজনীতির বাইরের শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তাদের ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচিতে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম নারায়ণগঞ্জের ‘পরিবারতন্ত্র ও মাফিয়াতন্ত্রের’ উদাহরণ টেনে বলেন, “এই মাফিয়া সিস্টেমের সঙ্গে আমরা আর খেলব না… এই খেলা বন্ধ করার জন্য আরেকটি গণঅভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুতি নেন।” তাদের মূল নির্বাচনী বার্তা হলো- পুরো নির্বাচন ব্যবস্থার পরিবর্তন।
ইসলামী আন্দোলনের বাজি ‘পিআর’ ও ‘ইসলামী শাসন’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের নির্বাচনী এজেন্ডা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। তাদের প্রধান দাবি দুটি-আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা। দলটির আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম (পীর সাহেব চরমোনাই) বলেন, “৫ আগস্টের পরে এদেশের মানুষ আর অন্য কোনো দলকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না। এখন বাংলাদেশের মানুষ ও মাটি চায় ইসলামী নীতি ও আদর্শের শাসন।” পিআর পদ্ধতিকে তারা দুর্নীতি ও মনোনয়ন বাণিজ্য বন্ধের একমাত্র উপায় হিসেবে তুলে ধরে ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছে।
বিএনপির কেন্দ্রবিন্দুতে ‘নেতৃত্ব রক্ষা’ ও ‘ষড়যন্ত্র’ প্রতিরোধ
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের অঙ্গ সংগঠনগুলোর কর্মসূচির মূল সুর ছিল দলের নেতৃত্বকে নিয়ে কটাক্ষকারীদেও বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা ও দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং অনতিবিলম্বে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ‘কটূক্তি’ ও পিআর পদ্ধতির মতো ‘ষড়যন্ত্রের’ বিরুদ্ধে সোচ্চার তারা।
বিএনপি নেতারা বলছেন, “খুব শীঘ্রই তারেক রহমান বাংলাদেশে ফিরে আসবে। তাই ষড়যন্ত্রকারীদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে।”
তাদের নির্বাচনী বার্তা হলো, জিয়া পরিবারের নেতৃত্বেই দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার সম্ভব এবং যেকোনো ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে তারা নির্বাচনে যাবে।
গণসংহতির ডাক ‘নতুন বন্দোবস্ত’ ও সংস্কারের
গণসংহতি আন্দোলন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সংস্কারমূলক রাজনীতির বার্তা দিচ্ছে।
দলটির প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ‘নতুন বন্দোবস্ত’র কথা বলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ওপর জোর দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “ক্ষমতা ব্যবহার করে ধনসম্পদ আহরণের যে ব্যবস্থা, তাকে বদল করতে হবে।” তাদের লক্ষ্য, একটি সংস্কার প্রস্তাবের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্যমত তৈরি করে নির্বাচনে যাওয়া।
শক্তি প্রদর্শনে জামায়াত
নির্বাচনী মাঠে জোরালোভাবে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
তারা তাদের সাংগঠনিক শক্তির এক বড় প্রদর্শনী করেছে গতকাল শনিবার (১৯ জুলাই)।
এদিন তারা ঢাকার জাতীয় সমাবেশে লক্ষাধিক নেতাকর্মী নিয়ে যোগদানের মাধ্যমে তারা নিজেদের শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি তুলে ধরেছে।
দলের নেতারা তাদের ৭-দফা দাবির কথা উল্লেখ করে বলছেন, এই দাবি বাস্তবায়ন হলে দেশে ‘ফ্যাসিবাদ’, ‘চাঁদাবাজি’ ও ‘দখলবাজি’ বন্ধ হবে। নারায়ণগঞ্জ মহানগর আমীর মাওলানা
আবদুল জব্বার বলেন, “আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন হলে আর নতুন কোনো স্বৈরাচারী জুলুম করতে পারবে না।”
তাদের নির্বাচনী বার্তা পরিষ্কার-সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির পর নির্বাচন আয়োজন এবং পাশাপাশি কুরআনের আইন প্রতিষ্ঠা।
মাঠে সক্রিয় খেলাফত মজলিস
অন্যদিকে, খেলাফত মজলিস একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনে খেলাফত মজলিস মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী এবিএম সিরাজুল মামুন অব্যাহতভাবে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে তাদের মনোনীত প্রার্থী ইলিয়াস আহমদসহ অন্যান্য আসনে ব্যাপক গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছে দলটি।
কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে স্লোগান ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে তারা সরাসরি ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর কৌশল নিয়েছে, যা প্রাক-নির্বাচনী প্রচারণার এক সুস্পষ্ট চিত্র।
নির্বাচনী বার্তা পৌঁছানোর লড়াইয়ে উত্তপ্ত রাজপথ
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজপথ এখন দলগুলোর জন্য তাদের নির্বাচনী বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
প্রতিটি দলই নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান তুলে ধরে ভোটারদের মন জয়ের লড়াইয়ে নেমে পড়েছে।
যা আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল ও আগ্রহোদ্দীপক করে তুলছে।







