
ঐতিহ্যবাহী ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জকে একটি পরিচ্ছন্ন, যানজটমুক্ত ও উন্নত জীবনমানের শহরে রূপান্তর করার লক্ষ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
শহরের প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানে ব্যবসায়ী সমাজের সক্রিয় সহযোগিতা চেয়েছেন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ জাহিদুল ইসলাম।
রবিবার (২৭ জুলাই) সকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতৃবৃন্দ ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এই আহ্বান জানান। সভায় শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, তীব্র যানজট, অবৈধ পার্কিং, ভাসমান দোকানপাট এবং কিশোর গ্যাং ও মাদকের মতো সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
উন্নত জীবনমানের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ
জেলা প্রশাসক মোঃ জাহিদুল ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারায়ণগঞ্জের অবদান অনেক বেশি। কিন্তু সেই তুলনায় এখানকার জীবনমান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। রাস্তাঘাটে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকা এবং এর থেকে ডেঙ্গুর মতো রোগের বিস্তার আমাদের জন্য অশোভন। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে আমরা সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।”
তিনি জানান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতির জন্য জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে দুটি আধুনিক বর্জ্য সংগ্রাহক যান প্রস্তুত করেছে, যা খুব শীঘ্রই কার্যক্রম শুরু করবে।
যানজট নিরসনে কঠোর পদক্ষেপ: নিয়ন্ত্রণে আসছে অটোরিকশা
সভার আলোচনায় শহরের প্রধানতম সমস্যা হিসেবে তীব্র নারায়ণগঞ্জ যানজট বিষয়টি উঠে আসে।
জেলা প্রশাসক বলেন, “শহরের যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত অটো রিকশা। প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার অটো নিয়ন্ত্রণে আমাদের জনবলের সংকট রয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের সাথে কথা বলেও জনবল বাড়ানো সম্ভব হয়নি। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমি চেম্বার অব কমার্সের সহযোগিতা কামনা করছি।”
যানজট নিরসনে কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়।
বিবি রোডের মতো শহরের কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাকে সম্পূর্ণ ‘অটোমুক্ত’ রাখা যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক। এছাড়া শহরের কয়েকটি রাস্তায় ‘ওয়ান ওয়ে’ বা একমুখী যান চলাচল ব্যবস্থা চালুর সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হবে বলে তিনি জানান।
বাস ব্যবস্থাপনা ও অবৈধ দখলমুক্ত ফুটপাত
বাস ব্যবস্থাপনার বিষয়ে জেলা প্রশাসক জানান, বাস মালিক ও চালকদের নিয়ে একটি ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে।
পাশাপাশি চালক ও হেলপারদের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক (ড্রেস) এবং নিয়োগপত্র নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “বাসের জন্য সুনির্দিষ্ট স্ট্যান্ড প্রয়োজন। আমরা পুরনো বাস টার্মিনাল এবং লিংক রোডের পার্কিং এলাকাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করে একটি টেকসই সমাধান খুঁজে বের করব।”
জেলা প্রশাসক কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, রাস্তার মোড়ে বা ফুটপাতে অবৈধভাবে ভ্যান বা দোকান বসতে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, “আমরা বারবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করি, কিন্তু মানবিকতার দোহাই দিয়ে অনেকেই ছাড় পেয়ে যান।
কিন্তু আর নয়। শহরের শৃঙ্খলা ফেরাতে আমাদের কঠোর হতেই হবে।”
সামাজিক অবক্ষয় রোধে চাই সামাজিক আন্দোলন
আলোচনার শেষের দিকে, “কিশোর গ্যাং এবং মাদকের বিরুদ্ধে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক।
আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পারিবারিকভাবেও সচেতনতা জরুরি। আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই শহরকে বদলে দেওয়া সম্ভব নয়।”
ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস: গঠিত হচ্ছে ‘সার্বিক ব্যবস্থাপনা কমিটি’
এই সকল সমস্যা সমাধানে এবং গৃহীত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের জন্য ‘সার্বিক ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠন করার ঘোষণা দেন জেলা প্রশাসক।
জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে এই কমটি গঠন করা হবে বলে জানান তিনি।
এই কমিটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বসে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবে।







