
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষাকে সীমাবদ্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছে বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশন (বিকেএ)। এই সিদ্ধান্তকে ‘বৈষম্যমূলক’ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে পরিপত্র বাতিলের দাবি জানিয়েছে তারা। তবে দেশের শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহল কিন্ডারগার্টেন মালিকদের এই পদক্ষেপকে কোমলমতি শিশুদের অধিকারের চেয়ে নিজেদের ‘ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার দৌড়ঝাঁপ’ হিসেবেই দেখছেন।
ঘটনার সূত্রপাত
সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করে, যেখানে শুধুমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে বলে উল্লেখ করা হয়। এর পরপরই তীব্র প্রতিবাদ জানায় কিন্ডারগার্টেন মালিকদের সংগঠন বিকেএ।
কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিবাদ ও হুঁশিয়ারি:
মঙ্গলবার (১২ আগস্ট) সকালে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সদস্য সচিব সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “এই পরিপত্র কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে, যা একটি বৈষম্যমূলক দৃষ্টান্ত।” তিনি আরও বলেন, “বৃত্তি শুধু আর্থিক অনুদান নয়, এটি শিশুর আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক স্বীকৃতি। এই সিদ্ধান্ত শিশুদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
সংগঠনটি আগামী ২০ আগস্টের মধ্যে পরিপত্রটি বাতিল না করলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ঘেরাও এবং ‘মার্চ ফর ঢাকা’র মতো কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন:
তবে, সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা আয়োজকদের কাছে তাদের এই আন্দোলনের পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্য জানতে চান। তাদের প্রশ্ন ছিল, “বৃত্তি পরীক্ষায় সুযোগ না পেলে কিন্ডারগার্টেনগুলো শিক্ষার্থী সংকটে পড়ে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে, এই ভীতি থেকেই কি এই আন্দোলনের ডাক দিচ্ছেন আপনারা, নাকি প্রকৃত অর্থেই কোমলমতি শিশুদের অধিকারের জন্য?”
জবাবে, কিন্ডারগার্টেন নেতারা নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমরা যে শিক্ষা দেই, তাতে আমাদের কনফিডেন্স আছে যে আমাদের শিক্ষার্থীরা আমাদের কাছেই থাকবে। তারপরও আমরা চাচ্ছি যে, আমাদের শিক্ষার্থীরা কেন বঞ্চিত হবে? কেননা দেশের অধিকাংশ শিশু শিক্ষার্থীরাই কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়ে।” এ সময় তারা দাবি করেন, এই সংখ্যা দেশের প্রায় ৬২ শতাংশ। নেতারা আরও যোগ করেন, “আমাদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কার চাইতে বেশি আশঙ্কা করছি শিক্ষার্থীদের ক্ষতির বিষয়ে।”।
উল্লেখ্য যে, কিন্ডারগার্টেনগুলোর এই প্রতিবাদ এবারই প্রথম নয়। এর আগেও, একই দাবিতে বন্দর, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীদের বৃত্তির সুযোগ দেওয়ার দাবিতে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়।
সরকারের অবস্থান ও বিশেষজ্ঞদের মত
অন্যদিকে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। মন্ত্রণালয়ের যুক্তি হলো, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মূলত নিম্নবিত্ত ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তানেরা পড়াশোনা করে। ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বৃত্তি পরীক্ষা’ মূলত এই শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে একটি আর্থিক প্রণোদনা। পক্ষান্তরে, কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের হওয়ায় এই প্রণোদনা তাদের জন্য ততটা জরুরি নয়।
এই প্রেক্ষাপটে সচেতন নাগরিক ও সাধারণ অভিভাবকরা কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের দাবিকে ভিন্ন চোখে দেখছেন। তাদের মতে, মূল কারণটি ব্যবসায়িক। একজন অভিভাবক বলেন, “বৃত্তি যদি শুধু সরকারি স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা পায়, তাহলে অনেক অভিভাবকই সন্তানকে কিন্ডারগার্টেন থেকে সরিয়ে সরকারি স্কুলে ভর্তি করাতে চাইবেন। এতে কিন্ডারগার্টেনগুলোর শিক্ষার্থী সংকট দেখা দেবে এবং তাদের ব্যবসা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। মূলত নিজেদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই তাদের এই মায়াকান্না।”
দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা বলছেন, “প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা কোনো মেধা যাচাইয়ের অলিম্পিয়াড নয়, এর একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য আছে। সরকারের উদ্দেশ্য হলো সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং ঝরে পড়া রোধ করা। এই বৃত্তি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণা। কিন্ডারগার্টেনগুলো এটিকে তাদের মার্কেটিংয়ের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে, যা বৃত্তির মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করে।”
তারা কিন্ডারগার্টেনগুলোর নানা অনিয়মের দিকেও ইঙ্গিত করেন। তারা বলেন, “অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেনে নেই প্রশিক্ষিত শিক্ষক, নেই শিশুদের মানসিক বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ। চড়া বেতন আর মুখস্থবিদ্যার চাপে শিশুদের শৈশব কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সরকারের উচিত এদের লাগাম টেনে ধরা, বৃত্তি পরীক্ষায় সুযোগ দিয়ে এদের ব্যবসাকে আরও উৎসাহিত করা নয়।”
একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য শিক্ষানুরাগী নাসরিন সুলতানা বলেন, “আমাদের স্কুলের অনেক বাচ্চার বাবা-মা দিনমজুর। এই বৃত্তির টাকাটা তাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া। কিন্ডারগার্টেনের বাচ্চারা এমনিতেই ভালো টিউশন ও কোচিংয়ের সুযোগ পায়। তাদের সাথে অসম প্রতিযোগিতায় আমাদের বাচ্চারা পিছিয়ে পড়ে। সরকারের এই সিদ্ধান্তটি একেবারে সঠিক এবং এটি সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।”
সব মিলিয়ে, একদিকে কিন্ডারগার্টেন মালিকদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার দাবি, অন্যদিকে সরকারের জনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করার নীতি—এই দুইয়ের সংঘাতে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। তবে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষাবিদদের বড় একটি অংশ সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে, যা দেশের সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি ইতিবাচক দিক হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।







