নারায়ণগঞ্জে জরাজীর্ণ অবস্থা জিয়া হলের, অবিলম্বে সংস্কারের দাবি

13
নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় অবস্থিত পরিত্যক্ত শহীদ জিয়া হলের সামনের দৃশ্য, যার দেয়ালে গাছ ও শ্যাওলা জন্মেছে।
দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে নারায়ণগঞ্জের জিয়া হল।

নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র চাষাড়ায় দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে তালাবদ্ধ শহীদ জিয়া হল। অযত্ন-অবহেলায় একসময়ের আধুনিক এই মিলনায়তনটি এখন ভুতুড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

সম্প্রতি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শহরের সাংস্কৃতিক কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ এটি সংস্কার করে পুনরায় চালুর দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন।

জেলা প্রশাসনও বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকবার আলোচনা হয়েছে।”

যেভাবে ধ্বংসের পথে জিয়া হল

১৯৮০-এর দশকের শেষে নির্মিত শহীদ জিয়া হল ছিল নারায়ণগঞ্জের সংস্কৃতিচর্চার প্রধান কেন্দ্র।

নাটক, সংগীত, নৃত্য বা চলচ্চিত্র প্রদর্শনী—সবকিছুর জন্য শহরের প্রধান ভরসা ছিল এই আধুনিক মিলনায়তনটি।

কিন্তু ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সাল থেকে হলটির কার্যক্রম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এরপর থেকে দীর্ঘ সময় পরিচর্যা না করায় ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

বর্তমানে হলের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে, দেয়াল ফেটে জন্মেছে বট-পাকুড়ের চারা, যার শেকড় ভবনের কাঠামোকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে।

মঞ্চ, চেয়ার বা ভেতরের কোনো আসবাবই আর অক্ষত নেই।

দিনের বেলাতেও ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করে, আর রাতে এটি মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

পেছনে শুধুই ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’

সাংস্কৃতিক কর্মীদের অভিযোগ, জিয়া হলের নামের কারণেই এটিকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে।

তাদের মতে, হলের নাম নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের কারণেই বিগত ১৬ বছর এর সংস্কার বা চালুর কোনো উদ্যোগ নেয়নি তৎকালীন সরকার।

শহরের প্রবীণ নাট্যকর্মী রুহুল আমিন বলেন, “জিয়া হল কেবল একটি ভবন নয়, এটা আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। রাজনৈতিক স্বার্থে এটিকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, যার ফলে শহরের সাংস্কৃতিক চর্চা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।”

এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সবশেষ উদাহরণ দেখা যায় ২০২৩ সালের এপ্রিলে।

শামীম ওসমানের অনুসারীরা রাতের আঁধারে হলের ছাদে থাকা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ম্যুরালটি ভেঙে ফেলে বলে তখন অভিযোগ উঠে।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতি

জিয়া হল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নারায়ণগঞ্জে বড় কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মতো সরকারি মিলনায়তন নেই।

ফলে অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠন তাদের নিয়মিত কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।

সাংস্কৃতিক জোটের এক সদস্য বলেন, আধুনিক মিলনায়তনের অভাবে আমরা বহু মেধাবী শিল্পী হারিয়েছি। জিয়া হল সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারত।”

পটপরিবর্তন ও নতুন দাবি

গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জিয়া হল সংস্কারের দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে।

সাংস্কৃতিক কর্মীদের দাবি একটাই—দ্রুত সংস্কার করে হলটি খুলে দেওয়া হোক। তবে এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কাও রয়েছে।

নাট্যকর্মী তানভীর আহমেদ বলেন, “আমরা ভয় পাচ্ছি, এই মূল্যবান জায়গায় হয়তো একদিন শপিং মল উঠবে। সেটা হলে এ শহরের সাংস্কৃতিক চেতনার মৃত্যু হবে।”

শহরের প্রবীণ বাসিন্দা মতিউর রহমানের কথায়, “জিয়া হল শুধু একটি বিল্ডিং নয়, এটা আমাদের হৃদয়ের অংশ। নতুন প্রজন্মকে শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য চেনাতে এর দরজা আবার খুলতেই হবে।”

সর্বোপরি, এখন দেখার বিষয়, শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসটি পুনরুদ্ধারে প্রশাসন কতো দ্রুত পদক্ষেপ নেবে?