গুরুত্ব হারাচ্ছেন সাবেক চার এমপি!

নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে কি অস্তমিত ‘চার তারকা’র সূর্য?

86
নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে কি অস্তমিত ‘চার তারকা’র সূর্য? গুরুত্ব হারাচ্ছেন সাবেক চার এমপি রেজাউল-আঙ্গুর-কালাম-গিয়াস!
নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে কি অস্তমিত ‘চার তারকা’র সূর্য? গুরুত্ব হারাচ্ছেন সাবেক চার এমপি রেজাউল-আঙ্গুর-কালাম-গিয়াস!

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একসময় যারা ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে, যাদের ইশারা ছাড়া দলের পাতা নড়তো না, সেই দাপুটে নেতারাই আজ নিজ দলে অনেকটা আগন্তুক। সময়ের বিবর্তনে এবং রাজনীতির কঠিন সমীকরণে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির চারজন সাবেক প্রভাবশালী এমপি অধ্যাপক রেজাউল করিম, আতাউর রহমান আঙ্গুর, অ্যাডভোকেট আবুল কালাম ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন এখন অস্তিত্ব সংকটে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবি, দলের দুঃসময়ে নিষ্ক্রিয় থাকা এবং কৌশলগত ভুলের কারণে রাজনীতির মাঠে তারা এখন অতীত হতে বসেছেন। বিপরীতে, রাজপথ কাঁপানো নতুন নেতৃত্বের ওপরই আস্থা রাখছে বিএনপির হাইকমান্ড।

নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁও) আসনের সাবেক এমপি ও প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রেজাউল করিম জেলার প্রবীণ রাজনীতিবিদদের অন্যতম। একসময় জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করা এই নেতা দলের সুসময়ে সব সুবিধাই ভোগ করেছেন। তবে তৃণমূলের অভিযোগ, গত ১৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ছিলেন পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। হামলা-মামলা এড়িয়ে ‘সেফ জোনে’ থেকে আয়েশী জীবন কাটিয়েছেন। এমনকি, তার ভাইদের আওয়ামী সরকারের আনুকূল্যে সিআইপি মর্যাদা পাওয়ার বিষয়টিও দলের ভেতরে তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

৫ আগস্টের পর তিনি মাঠে নামার চেষ্টা করলেও কর্মীরা তাকে ‘বোঝা’ হিসেবেই দেখছেন। ফলে ত্রয়োদশ নির্বাচনের আদলে আসন্ন রাজনৈতিক সেটআপেও তিনি ছিটকে পড়েছেন। এই আসনে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন রাজপথের পরীক্ষিত নেতা আজহারুল ইসলাম মান্নান, যা রেজাউল করিমের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য বড় ধাক্কা।

নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনের সাবেক এমপি আতাউর রহমান আঙ্গুর একসময় দাপুটে নেতা থাকলেও ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার কুশীলব হিসেবে তার নাম আসায় বড় ধরনের হোঁচট খান।

বিশ্লেষকদের মতে, সেই দুর্নাম ঘোচানোর সুযোগ তার সামনে ছিল। গত দেড় দশকে রাজপথে সক্রিয় থেকে তিনি পুনরায় দলের আস্থাভাজন হতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করতে ব্যর্থ হন।

৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে তিনি মনোনয়নের আশায় সরব হলেও কেন্দ্র বেছে নিয়েছে দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদকে। এরপরও আজাদকে ঠেকাতে অন্য প্রার্থীদের নিয়ে জোট বাঁধছেন আঙ্গুর, যা তার রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। দলে তার অবস্থান এখন অত্যন্ত নড়বড়ে।

নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর-বন্দর) আসনের তিনবারের এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম রাজনীতির মাঠে এসেছিলেন তার পিতা জালাল হাজীর ভাবমূর্তিকে পুঁজি করে। তবে এমপি থাকাকালীন জনকল্যাণমূলক উল্লেখযোগ্য কাজের অভাব এবং দলের দুঃসময়ে রাজপথ বিমুখতা তাকে জনবিচ্ছিন্ন করে তোলে। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিগত সময়ে আন্দোলনের নামে চার দেয়ালের ভেতরে বসে ফটোশেসন ছাড়া রাজপথে খুব একটা দেখা মিলে নি তার।

এসব কারণে ২০২২ সালে তার নেতৃত্বাধীন কমিটি বিলুপ্ত করে কেন্দ্র সাখাওয়াত-টিপুর নেতৃত্বে নতুন কমিটি ঘোষণা করে, যা ছিল কালামের জন্য এক বড় সংকেত। ৫ আগস্টের পর এমপি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে তিনি ও তার ছেলে আবুল কাউসার আশা দলের মনোনীত প্রার্থী ব্যবসায়ী নেতা মাসুদুজ্জামান মাসুদের বিরোধিতায় নেমেছেন। তবে কেন্দ্রের গ্রিন সিগন্যাল মাসুদের দিকেই থাকায় আবুল কালামের রাজনীতি এখন অস্তাচলে।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক এমপি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন নিজস্ব বলয় ও কর্মী বাহিনী নিয়ে জেলায় এখনও প্রভাবশালী। সরকার পতনের আগের আন্দোলনে তার ভূমিকা থাকলেও সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ড তাকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে দলের নেতৃত্ব নিয়ে ‘গণতন্ত্র নেই’ এমন বিতর্কিত মন্তব্য এবং একইসাথে নারায়ণগঞ্জ-৩ ও ৪ দুই আসন থেকে মনোনয়ন চাওয়াকে ‘দুই নৌকায় পা’ হিসেবে দেখছেন কর্মীরা।

নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে মনোনয়ন না পেলেও তিনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন নিয়ে তৎপর। তবে জোটের সমীকরণে এই আসনটি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর ভাগে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে গিয়াস উদ্দিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এই চার নেতা একসময় অপরিহার্য হলেও বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। তৃণমূলের স্পষ্ট বার্তা যারা দলের দুঃসময়ে পাশে ছিলেন না, সুসময়ে তাদের আর নেতৃত্বে দেখতে চায় না কর্মীরা। আধুনিক রাজনীতির ধারায় এবং কেন্দ্রের কঠোর অবস্থানে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে সাবেক এই এমপিদের প্রভাব ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে, আর সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে ত্যাগী ও নবীন নেতৃত্ব।