শামীম-বাবু-গাজীর কারণে হাতছাড়া নারায়ণগঞ্জের মেডিকেল কলেজ

84

দেশের অন্যতম শিল্প ও বাণিজ্যিক নগরী নারায়ণগঞ্জের লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ছিল একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী তিন সংসদ সদস্য-শামীম ওসমান, নজরুল ইসলাম বাবু এবং গাজী গোলাম দস্তগীরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে ‘বাণিজ্যিক স্বার্থ’ এবং রেষারেষির কারণে সেই স্বপ্ন এখন ধূলিসাৎ। নারায়ণগঞ্জের জন্য প্রস্তাবিত এই মেগা প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত হাতছাড়া হয়ে পার্শ্ববর্তী জেলা মুন্সিগঞ্জে চলে গেছে।

জানা গেছে, সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার মুন্সিগঞ্জ জেলায় নতুন একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপনের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। গত ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করার পর থেকেই শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে বইছে ক্ষোভের আগুন।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ নারায়ণগঞ্জ মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। কিন্তু প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই প্রকল্পটির স্থান নির্ধারণ নিয়ে শুরু হয় তিন এমপির লড়াই।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান চাইতেন মেডিকেল কলেজটি তার নির্বাচনী এলাকা সদরে হোক। নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের এমপি নজরুল ইসলাম বাবু এটি আড়াইহাজারে নেওয়ার জন্য তদবির শুরু করেন। অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের তৎকালীন এমপি ও মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী চাইতেন এটি রূপগঞ্জে স্থাপিত হোক।

অভিযোগ রয়েছে, নিজ এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণ হলে বিপুল অংকের ক্ষতিপূরণের টাকা পকেটে ভরা এবং রাজনৈতিক কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিলেন এই তিন প্রভাবশালী নেতা। এমনকি একটি সরকারি সংস্থা জমি দিতে চাইলেও শামীম ওসমানের আপত্তির কারণে তা সম্ভব হয়নি। এই তিন নেতার টানাহেঁচড়ায় তিন বছরেও এক ইঞ্চি জমির ফয়সালা হয়নি।

নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. এ এফ এম মুশিউর রহমান এই ব্যর্থতার পেছনে সরাসরি রাজনৈতিক কারণকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, “নারায়ণগঞ্জে একটি মেডিকেল কলেজ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু রাজনৈতিক সরকার ছাড়া এসব কাজ করা কঠিন। বিগত সরকারের তিন এমপি শামীম ওসমান, নজরুল ইসলাম বাবু ও গোলাম দস্তগীরের ভূমি নিয়ে টানাটানি ও ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে প্রজেক্টটি নারায়ণগঞ্জ থেকে চলে গেছে। এটি এখন মুন্সিগঞ্জে নির্মিত হবে।”

নারায়ণগঞ্জবাসী বলছেন, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং শিল্পকারখানার আধিক্যের কারণে এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ অপরিহার্য ছিল। মুন্সিগঞ্জে মেডিকেল কলেজ হওয়ায় তারা খুশি হলেও, নারায়ণগঞ্জের বঞ্চনা মেনে নিতে পারছেন না। অনেক সচেতন নাগরিক মনে করছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার বাড়ি মুন্সিগঞ্জে হওয়ায় এবং নারায়ণগঞ্জে কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক অভিভাবক না থাকায় প্রকল্পটি দ্রুত সেখানে স্থানান্তরিত হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জবাসী বলছেন, “নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতি দেশকে সমৃদ্ধ করছে, অথচ এখানকার মানুষ সামান্য চিকিৎসার জন্য ঢাকায় দৌড়াতে হয়। শামীম-বাবু-গাজীদের ব্যক্তিগত লোভের বলি হলো কয়েক লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা। এই বঞ্চনা আমরা মেনে নেব না।”

শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জে হাজার হাজার শ্রমিক বিভিন্ন পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল ও গবেষণা কেন্দ্র থাকলে শ্রমিকরা উপকৃত হতো। কিন্তু রাজনৈতিক রেষারেষিতে সেই সুযোগ হাতছাড়া হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী একটি মেডিকেল কলেজের জন্য ৩৩ একর জমি প্রয়োজন। জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে, তারা কয়েকবার জমির প্রস্তাব পাঠালেও তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।

নারায়ণগঞ্জের সচেতন মহলের দাবি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার দায় যেন সাধারণ মানুষ না পায়। সরকার যেন দ্রুত নারায়ণগঞ্জের জন্য বিকল্প কোনো বড় স্বাস্থ্য প্রকল্প বা পুনরায় মেডিকেল কলেজের উদ্যোগ গ্রহণ করে।