গিয়াস ও শাহ আলমকে হারিয়ে দেয়ার চ্যালেঞ্জ ছিলো রিয়াদের

157

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনে জয়ী হতে পারেননি বিএনপি জোট মনোনীত প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী। তবে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, কাসেমী হারলেও ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক লড়াইয়ে বড় জয় পেয়েছেন ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনে রিয়াদের প্রধান লক্ষ্য ছিল বিএনপির প্রার্থীকে জয়ী করা এবং তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনকে মাঠ থেকে নিশ্চিহ্ন করা, যে কাজে তিনি শতভাগ সফল হয়েছেন।

৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে ফতুল্লায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন এবং রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরীর মধ্যে দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়। গিয়াস উদ্দিন ও তাঁর অনুসারীরা অভিযোগ করেছিলেন, রিয়াদ চৌধুরী বেছে বেছে গিয়াস শিবিরের নেতাকর্মীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলায় আসামি করছেন। অন্যদিকে, রিয়াদ চৌধুরীর দাবি ছিল-গিয়াস উদ্দিন জেলা বিএনপির সভাপতি থাকাকালীন ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করে নিজের ব্যক্তিগত ‘বলয়’ ও ‘পছন্দের লোকদের’ প্রাধান্য দিয়েছেন।

এই কথার লড়াই মাঠ পর্যায়েও গড়ায়। পরবর্তীতে তদন্ত কমিটির সুপারিশে গিয়াস উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন জেলা বিএনপির কমিটি ভেঙে দিলে রিয়াদ শিবির ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জে মিষ্টি বিতরণ করে উৎসব পালন করে। পরে রিয়াদ চৌধুরীকে দল থেকে বহিষ্কার ও গ্রেপ্তার করা হলে উল্টো উল্লাস করে গিয়াস শিবির।

নির্বাচনের আগে গিয়াস উদ্দিন দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ ও ৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলে দল তাঁকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে। তৃণমূল নেতাদের মতে, গিয়াস উদ্দিন ও আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ আলমকে প্রতিহত করতে এবং দলীয় প্রার্থীর শক্তি বাড়াতে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর বিশেষ সুপারিশে রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী ও মনিরুল আলম সেন্টুর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয় বিএনপি হাইকমান্ড।

ভোটের ময়দানে রিয়াদ চৌধুরী ও সেন্টু একনিষ্ঠভাবে কাসেমীর পক্ষে কাজ করেন। ফলাফল বলছে, এই আসনে জয়ী এনসিপি প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিন পেয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজার ভোট। বিএনপি সমর্থিত মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী পেয়েছেন প্রায় ৮১ হাজার ভোট। অন্যদিকে, একসময়ের দাপুটে নেতা গিয়াস উদ্দিন পেয়েছেন মাত্র ৪ হাজার ৭৭৯ ভোট। বিপুল ব্যবধানে হেরে তিনি তাঁর জামানত হারিয়েছেন। এমনকি নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনেও ২০ হাজার ৩৭৯ ভোট পেলেও সেখানেও তিনি জামানত রক্ষা করতে পারেননি।

অন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ আলম ৩৯ হাজার ৫৭৯ ভোট পেলেও গিয়াস উদ্দিনের এই শোচনীয় পরাজয় রিয়াদ চৌধুরীর জন্য এক বড় রাজনৈতিক স্বস্তি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, রিয়াদ চৌধুরীর প্রধান লক্ষ্য কাসেমীকে জেতানোর চেয়েও বড় ছিল গিয়াস উদ্দিনকে রাজনৈতিকভাবে ‘অকার্যকর’ প্রমাণ করা। গিয়াস উদ্দিনের মাত্র ৪ হাজার ভোট পাওয়া প্রমাণ করেছে যে, দলের বাইরে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো শক্ত ভিত্তি নেই। মুফতি কাসেমী হয়তো এমপি হতে পারেননি, কিন্তু রিয়াদ চৌধুরী প্রমাণ করতে পেরেছেন যে ফতুল্লা বিএনপির মাঠে ‘গিয়াস যুগের’ অবসান ঘটেছে।

স্বতন্ত্র প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন ও শাহ আলমের পাশে থাকা নেতাকর্মীদের ভবিষ্যৎও এখন চরম ঝুঁকিতে। দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ায় এবং নির্বাচনে ভরাডুবির পর তাঁরা এখন রাজনৈতিকভাবে অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে, বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হওয়া রিয়াদ ও সেন্টু এখন ফতুল্লা বিএনপির মূল ধারায় আরও শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন।

সব মিলিয়ে, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে ভোটের ফলাফলে আব্দুল্লাহ আল আমিন জয়ী হলেও, ফতুল্লা বিএনপির দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ে বিজয়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী।